তৌকির আহাম্মেদ হাসু স্টাফ রিপোর্টার:
প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দূরত্ব পেরিয়ে ভালোবাসার টানে ফিনল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন ৩৮ বছর বয়সী এক যুবক। দুই দেশের দূরত্ব ঘুচিয়ে প্রেমের বন্ধনে জড়িয়ে সরিষাবাড়ীর মাটিতে গড়েছেন নতুন সংসার। ধর্ম পরিবর্তন করে বাঙালি তরুণীকে বিয়ে করার এ ঘটনা নিয়ে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার আওনা ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে চলছে আলোচনা।
তরুণীর নাম শান্তিনা জাহান সিমি (২৮)। তিনি ওই গ্রামের চা বিক্রেতা রফিকুল ইসলামের মেয়ে। তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর রায়ান বাবু (৫) নামে এক ছেলেকে নিয়ে চলছিল জীবন। এরই মধ্যে ফিনল্যান্ডের নাগরিক মিকা পেত্তেরি সিমোলার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফোনে আলাপের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সেই সম্পর্ক একপর্যায়ে বিয়েতে গড়ায়। গত ২ অক্টোবর থেকে তাঁরা একসঙ্গে ঘরসংসার করছেন বলে জানা গেছে।
সিমির চাচা আনিছুর রহমান জানান, সিমির ফুপু বিলকিছ বেগমের দেবর কবীর হোসেন স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ফিনল্যান্ডে বসবাস করেন। তাঁর মাধ্যমেই মিকার সঙ্গে সিমির পরিচয়ের সূত্রপাত। মিকার আগের স্ত্রী না থাকায় তিনি বাংলাদেশে বিয়ে করার আগ্রহের কথা কবীর হোসেনকে জানান। পরে মুঠোফোনে সিমির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ শুরু হয়। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁদের বিয়েতে দেনমোহর ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।ফিনল্যান্ডের যুবক খ্রিস্টান ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলামী নাম রাখেন মিকাইল।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মিকা পেত্তেরি সিমোলা ফিনল্যান্ডের নাগরিক। তিনি মিকা নামে পরিচিত। তাঁর বাবার নাম জোহা পেত্তেরি। জন্মস্থান হিসেবে ফিনল্যান্ডের তোইয়ালা । গত ২ অক্টোবর তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে সিমি তাঁকে গ্রহণ করে জামালপুরে নিয়ে আসেন।
সেদিনই জামালপুর জজ কোর্টের নোটারি পাবলিক অ্যাডভোকেট আব্দুল করীমের মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে সংক্রান্ত অঙ্গীকারনামা সম্পন্ন হয়। একই সময় মিকা খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর নতুন নাম রাখা হয় মিকাইল। পরে নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে সান্তনা জাহান সিমি নিশ্চিত করেন।
বিবাহের অঙ্গীকারসংক্রান্ত নোটারি পাবলিকের দলিলে ২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ ও ৫০৬৫ নম্বর রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ রয়েছে। দলিলটিতে দুজনের পরিচয়, পারস্পরিক সম্পর্ক ও বিবাহের সিদ্ধান্তের কথা লেখা হয়েছে।
ফিনল্যান্ডের আইনগত অনুমতির সনদ মিকার আগের বিয়ের বিচ্ছেদসংক্রান্ত একটি নথিতে ও
বিবাহবিচ্ছেদের অনুমতি দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। নথিতে জেলা আদালতের সচিব রিক্কা পাউোনেনের স্বাক্ষরের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ফিনল্যান্ডের ডিজিটাল অ্যান্ড পপুলেশন ডাটা সার্ভিসেস এজেন্সির ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের একটি সনদে উল্লেখ রয়েছে, দেশটির আইন অনুযায়ী মিকা পেত্তেরির সঙ্গে শান্তিনা জাহান সিমির বিয়েতে কোনো আইনগত বাধা নেই।
এ বিষয়ে শান্তিনা জাহান সিমি বলেন, “আমার স্বামী ফিনল্যান্ডের নাগরিক হলেও তিনি ওই দেশে বিয়ের অনুমতি নিয়ে এবং খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণের পর আমাকে বিয়ে করেছেন। আমরা এখন একসঙ্গে ঘরসংসার করছি।”
এ ব্যাপারে সিমির বাবা রফিকুল ইসলাম ও চাচা আনিছুর রহমান মন্ডল বলেন, তাঁদের পরিবারের সদস্য বিলকিছ বেগমের দেবর কবীর হোসেন স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ফিনল্যান্ডে বসবাস করেন। তাঁর মাধ্যমেই মিকার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব ও ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ হয় । মিকা বাংলাদেশি নারীকে বিয়ে করার আগ্রহ নিয়ে ২ অক্টোবর বাংলাদেশে আসেন। পরে নোটারি পাবলিক অ্যাডভোকেট আব্দুল করীমের মাধ্যমে বিয়েসংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের বিয়েতে পরিবারের সদস্যরা খুশি।
স্থানীয় সমাজসেবক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, চা বিক্রেতা রফিকুল ইসলামের মেয়ের সঙ্গে ফিনল্যান্ডের নাগরিকের বিয়ে হয়েছে। এতে তাঁরা আনন্দিত।
এদিকে সরিষাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, এ বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, আগামী ১৮ অক্টোবর মিকার ফিনল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় ভিসা ও পাসপোর্টের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সিমি ও তাঁর ছেলেকে ফিনল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।