আবু সায়েম মোহাম্মদ সা’-আদাত উল করীম:
১৯৭৪ সালের বাংলাদেশের দু’র্ভিক্ষকে সাধারণত ভয়াবহ বন্যার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু গবেষণার তথ্য বলছে, বন্যা ছিল সংকটের একটি বড় কারণ; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল খাদ্য আমদানির ঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, খাদ্যবণ্টনের বৈষম্য, মজুতদারি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা। কিছু গবেষণা সরাসরি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতিকেও দুর্ভিক্ষ তীব্র হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শহরে রেশন, গ্রামে ক্ষুধা
১৯৭৪ সালের সরকারি খাদ্যবণ্টন ব্যবস্থার একটি বড় বৈপরীত্য ছিল শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য।
গবেষণা অনুযায়ী, ওই বছর সরকারি খাদ্যবণ্টন ব্যবস্থার প্রায় ৬০ শতাংশ রেশন শহরাঞ্চলে গিয়েছিল, যদিও দেশের ৯ শতাংশেরও কম মানুষ শহরে বাস করত। ১৯৭৩–৭৫ সময়ে সরকারি রেশনিংয়ের আওতায় প্রায় পুরো শহুরে জনগোষ্ঠী থাকলেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ এর আওতায় ছিল।
ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের বড় অংশ সরকারি খাদ্য নিরাপত্তার বাইরে থেকে যায়।
আমদানি ব্যবস্থায় ‘ভুয়া আমদানিকারক’
স্বাধীনতার পর বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে আমদানি লাইসেন্স ছিল অত্যন্ত মূল্যবান।
১৯৭৪ সালের সমকালীন সংবাদপত্রের তথ্য উদ্ধৃত করে Cambridge-এর একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান ২৫ হাজার আমদানি পারমিটধারীর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজারকে ‘fake importer’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
একই সূত্রে আওয়ামী লীগ কর্মী ও সমর্থকদের ইন্ডেন্টিং ফার্মের অনুমতি পাওয়ার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানে সতর্কতা জরুরি—১৫ হাজার ছিল তৎকালীন মন্ত্রীর বক্তব্য; এটি আদালতে প্রমাণিত ১৫ হাজার দুর্নীতির মামলার সংখ্যা নয়।
খাদ্য মজুত ও কালোবাজার
১৯৭৪ সালে চালের দাম দ্রুত বাড়ে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বন্যায় ফসলের ক্ষতির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীদের একাংশ ভবিষ্যতে দাম বাড়বে ধরে খাদ্যশস্য মজুত করেছিল। তবে মজুতদারির সঠিক পরিমাণের প্রত্যক্ষ প্রমাণ সীমিত বলে গবেষণাতেও সতর্ক করা হয়েছে।
চোরাচালানের অভিযোগও ছিল ব্যাপক। কিন্তু খাদ্যশস্যের কত পরিমাণ দেশ থেকে পাচার হয়েছিল, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য ঐকমত্য নেই। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে চোরাচালানকে একমাত্র বা প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সতর্কতা দেখা যায়।
শুধু খাদ্যের ঘাটতি ছিল না
অমর্ত্য সেনের বিশ্লেষণে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মানুষের খাদ্য কেনার ক্ষমতা হারানো।
বন্যায় কৃষিশ্রমিকের কাজ কমে যায়, আয় কমে যায় এবং একই সময়ে চালের দাম বাড়ে। ফলে শ্রমজীবী মানুষ বাজারে খাদ্য থাকা সত্ত্বেও তা কেনার ক্ষমতা হারায়। সেনের গবেষণায় শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষের এই ‘entitlement’ বা খাদ্যে প্রবেশাধিকারের সংকটকে দুর্ভিক্ষ বোঝার গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
২০২৬ সালের একটি গবেষণায়ও দেখা যায়, ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে কৃষিশ্রমিকের মজুরি প্রায় ৪৩ শতাংশ কমে যায় বলে পূর্ববর্তী গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।
সরকারের ব্যর্থতা কোথায়?
২০০৬ সালের গবেষক Caf Dowlah-এর বিশ্লেষণে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কারণ হিসেবে বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি খাদ্য আমদানিতে সরকারের অক্ষমতা, শহুরে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীর দিকে ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য সরবরাহের অগ্রাধিকার এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ দুর্ভিক্ষের দায়কে শুধু প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে দিলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যায়।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যে অনেক বড় বড় সংখ্যা প্রচলিত আছে—বিশেষ করে চোরাচালান, ত্রাণ আত্মসাৎ এবং মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে।
এসবের সবগুলো সমানভাবে প্রমাণিত নয়।
উদাহরণ হিসেবে, অমর্ত্য সেন তাঁর গবেষণায় তৎকালীন সরকারি মৃত্যুর হিসাব ২৬ হাজার উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক সূত্রে আরও বেশি মৃত্যুর অনুমান পাওয়া যায়। তাই নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা নিয়ে চূড়ান্ত দাবি করার আগে উৎস ও পদ্ধতি উল্লেখ করা জরুরি।
তাহলে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের দায় কার?
সব তথ্য একত্র করলে চিত্রটি দাঁড়ায়—
বন্যা ছিল বড় ধাক্কা।
কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল—
খাদ্য আমদানি ও সরকারি মজুতের সংকট;
চালের মূল্যবৃদ্ধি;
গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও মজুরি কমে যাওয়া;
শহরমুখী সরকারি রেশন ব্যবস্থা;
মজুতদারির অভিযোগ;
চোরাচালান;
আমদানি লাইসেন্সে অনিয়মের অভিযোগ;
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগ।
ফলে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষকে শুধু ‘বন্যার দুর্ভিক্ষ’ বলা পুরো চিত্রটি তুলে ধরে না। আবার শুধু দুর্নীতিকেই এর একমাত্র কারণ বলা হলেও ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায় হবে। গবেষণার তথ্য বরং দেখায়—প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্বল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে কাজ করেছিল।
শেষ প্রশ্ন
১৯৭৪-এর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এটিই—
যখন মানুষ খাদ্যের অভাবে মরছিল, তখন রাষ্ট্রের হাতে থাকা সীমিত খাদ্য কি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল এমন মানুষের কাছে পৌঁছেছিল?
উপলব্ধ গবেষণা বলছে, উত্তরটি পুরোপুরি ‘হ্যাঁ’ নয়।
আর সেখানেই ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাস নয়—এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, খাদ্যবণ্টন, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং দুর্নীতির অভিযোগে ঘেরা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কঠিন অধ্যায়।
সূত্র: Oxford Academic-এ অমর্ত্য সেনের Famine in Bangladesh; Wiley-তে Caf Dowlah-এর গবেষণা; Cambridge University Press-এর Bangladesh: An Unfinished Revolution?; এবং ২০২৬ সালে প্রকাশিত Naomi Hossain-এর Theorising the Politics of Famine: Bangladesh in 1974।