রেহানা ফেরদৌসী ॥
কলামিস্ট)
মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠের সুরে দেবীর আগমনী বার্তা নিয়ে শরৎ যেন অন্যরকম এক আবহে জেগে ওঠে। এবার ১০ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার, মহালয়ার পুণ্যতিথিতে শুরু হবে দেবীপক্ষের শুভ সূচনা। চারপাশে তখন শিউলির সুবাস, কাশফুলের দোল আর উৎসবের আবহে মুখর হয়ে উঠবে প্রকৃতি।
প্রচলিত পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার দেবীর আগমন ঘোটক বাহনে। লোকবিশ্বাসে দেবীর আগমনের এই বাহনেরও একটি প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। তবে সেই প্রতীকের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মহালয়ার চিরন্তন আহ্বান—অশুভের বিনাশ, শুভের প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের হৃদয়ে নতুন আশার আলো জ্বালানো।
তবে মহালয়ার এই আগমনী আবহ কেবল ধর্মীয় পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ছুটি, অবসর ও উৎসবমুখর পরিবেশও দেশের সামাজিক জীবনে তৈরি করে এক স্বতন্ত্র আনন্দের আবহ।
বাংলাদেশে ধর্মীয় উৎসবের ছুটি অনেকের কাছেই হয়ে ওঠে পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ। দীর্ঘ ছুটিতে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়াতে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হয়, শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে অবসর উপভোগ করে। ঈদের ছুটিতে যেমন দেশের নানা প্রান্তে মানুষের ভ্রমণ ও পারিবারিক মিলন ঘটে, তেমনি বুদ্ধ পূর্ণিমা,বড়দিন কিংবা দুর্গাপূজার ছুটিতেও অনেকে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে বের হন। উৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্য স্বতন্ত্র; কিন্তু ছুটির অবকাশে তৈরি হওয়া আনন্দ ও বিনোদন অনেকের জীবনেই হয়ে ওঠে একটি সাধারণ সামাজিক অভিজ্ঞতা।
এই আনন্দের নিজস্ব একটি সৌন্দর্য আছে। উৎসবের দিনগুলোতে ব্যস্ত জীবনে যেন সাময়িক বিরতি আসে। মানুষ আপনজনকে সময় দেয়, প্রিয় জায়গায় ঘুরতে যায়, কোথাও মেলা বা সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করে। আলোকসজ্জা, সাজসজ্জা ও উৎসবের নানা আয়োজন মিলিয়ে শহর ও জনপদে তৈরি হয় প্রাণচাঞ্চল্য। ফলে একটি ধর্মীয় উৎসবের আবহও তার নিজস্ব পরিসর অতিক্রম করে বৃহত্তর সামাজিক জীবনে আনন্দের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।
মহালয়ার আগমনী তাই শরতের উৎসবমুখর সময়ের একটি পরিচিত সূচনা। এই সময়কে ঘিরে নানা বয়সের মানুষ নানা ভাবে আনন্দ খুঁজে নেয়—কেউ ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হন, কেউ পরিবারের সঙ্গে অবসর কাটান, কেউ বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন, আবার কেউ কেবল উৎসবের সৌন্দর্য ও পরিবেশ উপভোগ করেন।
বাংলাদেশের উৎসবজীবনের এই বৈচিত্র্যই আমাদের সংস্কৃতিকে প্রাণবন্ত করে। প্রতিটি ধর্মীয় উৎসব তার নিজস্ব বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও রীতি নিয়ে পালিত হয়; একই সঙ্গে উৎসবের ছুটি মানুষের জীবনে এনে দেয় মিলন, অবসর ও আনন্দের সুযোগ। ঈদ, বুদ্ধ পূর্ণিমা, দুর্গাপূজা কিংবা বড়দিন—প্রতিটি উৎসবই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে বাংলাদেশের সামগ্রিক জীবনযাত্রায় একটি করে রঙ যোগ করে।
মহালয়ার এই শুভক্ষণে তাই দেবীর আগমন হোক মঙ্গল ও কল্যাণের প্রত্যাশা নিয়ে। উৎসবের দিনগুলো মানুষের জীবনে নিয়ে আসুক স্বস্তি, অবসর ও প্রিয়জনের সঙ্গে কিছু সুন্দর মুহূর্ত। ধর্মীয় উৎসবগুলো তাদের নিজস্ব মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে উদযাপিত হোক, আর সেই উৎসবমুখর দিনগুলোয় বাংলাদেশ হয়ে উঠুক আরও প্রাণবন্ত, আরও আনন্দময়।
কারণ উৎসব শুধু ক্যালেন্ডারের একটি দিন নয়—এটি মানুষের জীবনে একটু থামার, আপনজনের কাছে ফেরার এবং আনন্দকে নতুন করে অনুভব করার একটি উপলক্ষ। আর এমন নানা উৎসবের রঙেই তো আমাদের বাংলাদেশ হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত, আরও বহুরূপী।