1. admin2@kalernatunsangbad.com : admin : Admin
  2. admin@kalernatunsangbad.com : Khairul Islam :
রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
জাল যার জলা তার, জাল যার হাওর — মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ তুহিন হত্যার বিচার দাবিতে তাড়াইলে দোয়া মাহফিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সাংবাদিক এসোসিয়েশনের নতুন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ ভূমি জালিয়াতি ও জাল দলিলের অভিযোগ, জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে কিশোরগঞ্জে সংবাদ সম্মেলন রাজশাহী ব্যাটালিয়ন ১বিজিবি কর্তৃক সীমান্তে অভিযান মদ জব্দ রাজারহাটে এসআই আতিকুলের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন হোসেনপুরে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ জনজীবন শেখ হাসিনা কি ফিরবেন, নাকি বাংলাদেশ বদলে গেছে? কুলিয়ারচরে স্বামীর বাড়ি থেকে গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার অবৈধ ড্রেজার বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়ে কুমিল্লা ডিসি অফিসে আবেদন
শিরোনাম
জাল যার জলা তার, জাল যার হাওর — মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ তুহিন হত্যার বিচার দাবিতে তাড়াইলে দোয়া মাহফিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সাংবাদিক এসোসিয়েশনের নতুন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ ভূমি জালিয়াতি ও জাল দলিলের অভিযোগ, জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে কিশোরগঞ্জে সংবাদ সম্মেলন রাজশাহী ব্যাটালিয়ন ১বিজিবি কর্তৃক সীমান্তে অভিযান মদ জব্দ রাজারহাটে এসআই আতিকুলের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন হোসেনপুরে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ জনজীবন শেখ হাসিনা কি ফিরবেন, নাকি বাংলাদেশ বদলে গেছে? কুলিয়ারচরে স্বামীর বাড়ি থেকে গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার অবৈধ ড্রেজার বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়ে কুমিল্লা ডিসি অফিসে আবেদন

মানুষ রবীন্দ্রনাথ: বিশ্বকবির অন্তর্জীবনের অনালোচিত অধ্যায়

  • প্রকাশ কাল শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩১ বার পড়েছে


লেখাঃরেহানা ফেরদৌসী

একজন মানুষকে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় তার সাফল্য জানা নয়; বরং জানা, তিনি একান্ত ব্যক্তিগত জীবনে কীভাবে ভালোবেসেছিলেন, কীভাবে হারিয়েছিলেন এবং কীভাবে বেঁচে ছিলেন।
২২ শ্রাবণ এলেই বাঙালির মন অন্য এক আবহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রসংগীতের সুর ভেসে আসে চারদিক থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার কবিতার পঙ্‌ক্তি। সংবাদপত্রের সাহিত্যপাতা ভরে ওঠে তার জীবন, দর্শন ও সৃষ্টিকর্মের বিশ্লেষণে। আমরা শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি নোবেলজয়ী কবিকে, বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠাতাকে, বাংলা ভাষার সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিককে।
কিন্তু প্রতি বছর এই শ্রদ্ধার ভিড়ে একটি প্রশ্ন নীরবে হারিয়ে যায়—আমরা কি সত্যিই রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করি, নাকি শুধু তার খ্যাতিকে?
আমরা তার কবিতা পড়ি, কিন্তু তার কান্নার ইতিহাস পড়ি না।আমরা তার গান গাই, কিন্তু তার নীরবতার শব্দ শুনি না।আমরা তার সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করি, অথচ তার সংসার, তার পরিবার, তার ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং তার একাকীত্বকে খুব কমই আলোচনায় আনি।
সম্ভবত এ কারণেই আজও “বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ” আমাদের কাছে পরিচিত; কিন্তু “মানুষ রবীন্দ্রনাথ” অনেকটাই অচেনা।
একজন লেখকের সাহিত্যকে তার জীবন থেকে পুরোপুরি আলাদা করা যায় না। কলমে যে শব্দ জন্ম নেয়, তার শিকড় থাকে জীবনের অভিজ্ঞতায়। আনন্দ, প্রেম, বিচ্ছেদ, মৃত্যু, প্রাপ্তি, অপূর্ণতা—সবকিছু মিলিয়েই একজন শিল্পীর সৃষ্টিজগৎ নির্মিত হয়। রবীন্দ্রনাথও এর ব্যতিক্রম নন। তার সাহিত্যকে বুঝতে হলে শুধু গীতাঞ্জলি, গোরা কিংবা ঘরে-বাইরে পড়লেই হবে না; জানতে হবে তার ঘরের ভেতরের মানুষটিকেও।
আমরা যাকে “বিশ্বকবি” বলে সম্মান জানাই, তিনি একদিন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির একটি শিশু ছিলেন। তিনি একজন পিতার স্নেহে বড় হয়েছেন, আবার সেই পিতাকেও হারিয়েছেন। তিনি দাম্পত্যজীবনে ভালোবেসেছেন, আবার অকালে জীবনসঙ্গিনীকে হারিয়ে দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা বয়ে বেড়িয়েছেন। তিনি সন্তানদের জন্য নতুন শিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন, অথচ নিজের জীবদ্দশায় সন্তানহারা পিতার অসহনীয় শোকও বহন করেছেন।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য হলো, কোনো মহান মানুষই তার মানবিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন নন। বরং তার মহত্ত্বের ভিত গড়ে ওঠে সেই মানবিক অভিজ্ঞতার ওপরই।
রবীন্দ্রনাথের জীবনও ছিল তেমনি। তার সৃষ্টির আলো যতটা উজ্জ্বল, তার ব্যক্তিগত জীবনের ছায়াগুলোও ততটাই গভীর। সেই ছায়ার মধ্যে রয়েছে শৈশবের নিঃসঙ্গতা, পারিবারিক দায়িত্ব, দাম্পত্যের কোমলতা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা এবং মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থান। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিনি কখনো সেই বেদনাকে কেবল ব্যক্তিগত রাখেননি; নিজের অশ্রুকে তিনি মানবতার ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন। তাই তার লেখা পড়লে মনে হয়, তিনি যেন শুধু নিজের কথা বলেননি—সমস্ত মানুষের হৃদয়ের ভাষাই লিখেছেন।
আমরা তার প্রয়াণবার্ষিকীতে ফুল দিই, মালা দিই, গান গাই। কিন্তু হয়তো খুব কম মানুষই ভাবি—যে মানুষটির প্রতিকৃতির সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তারও একটি সংসার ছিল। দিনের শেষে তিনিও ঘরে ফিরতেন। তারও ছিল অপেক্ষা, উদ্বেগ, আনন্দ, অপূর্ণতা এবং দীর্ঘশ্বাস।তিনি শুধু নোবেলজয়ী কবি ছিলেন না।তিনি ছিলেন এক স্ত্রীর স্বামী।তিনি ছিলেন পাঁচ সন্তানের পিতা।তিনি ছিলেন এক পুত্র, যিনি পিতার মৃত্যুতে শোকাহত হয়েছেন।তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি ব্যক্তিগত ক্ষতকে কখনো অভিযোগে নয়, সৃষ্টিতে রূপ দিয়েছেন।সম্ভবত এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ আজও আমাদের এত কাছের। কারণ তিনি শুধু প্রতিভার জন্য মহান নন; তিনি মহান তার সহিষ্ণুতার জন্য, তার মানবিকতার জন্য এবং গভীরতম ব্যক্তিগত বেদনাকেও বিশ্বমানবের সম্পদে রূপান্তর করার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য।

ঠাকুরবাড়ি ছিল শুধু একটি অভিজাত পরিবারের বাসভবন নয়; ছিল উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। সেখানে সাহিত্যচর্চা ছিল, সঙ্গীত ছিল, নাটক ছিল, দর্শন ছিল,সমাজসংস্কারের আলোচনা ছিল, আবার ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চিন্তার অবাধ প্রবাহ। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর কাছে পৃথিবীকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সর্বকনিষ্ঠ সন্তানদের একজন। দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব—আধ্যাত্মিক, শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং গভীর চিন্তার মানুষ। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের মা সারদা দেবী ছিলেন সংসারের নীরব কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ব্যস্ত ও বৃহৎ পরিবারের নিয়মে ছোটবেলার রবীন্দ্রনাথ মায়ের সান্নিধ্য খুব বেশি পাননি। কৈশোরেই মায়ের মৃত্যু তার জীবনে এক নিঃশব্দ শূন্যতার সৃষ্টি করে।
পরিবারের সদস্যসংখ্যা ছিল অনেক। বড় ভাই-বোনদের মধ্যে কেউ ছিলেন দার্শনিক, কেউ সাহিত্যিক, কেউ সুরকার, কেউ চিত্রকর, কেউ সমাজসংস্কারক।দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন পণ্ডিত ও দার্শনিক, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভারতীয় আইসিএস কর্মকর্তা,জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন নাট্যকার, সুরকার ও শিল্পচর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ। এই বহুমাত্রিক পরিবেশ রবীন্দ্রনাথের শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।তবু এই ঐশ্বর্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও তার শৈশব পুরোপুরি আনন্দময় ছিল না। বিশাল বাড়ির নিয়মকানুন, গৃহশিক্ষকের কঠোরতা এবং অভিভাবকদের ব্যস্ততার কারণে তিনি অনেক সময় একাকীত্ব অনুভব করতেন। পরে তার স্মৃতিকথা জীবনস্মৃতি-তে সেই শৈশবের নিঃসঙ্গতার নানা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেই নিঃসঙ্গতাই হয়তো তাকে প্রকৃতির কাছে নিয়ে গিয়েছিল, কল্পনার জগতে ডুব দিয়েছিল এবং শব্দের সঙ্গে তার আজীবনের বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিল।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছেলেকে শুধু বিদ্যাশিক্ষা দেননি; দিয়েছিলেন প্রকৃতিকে দেখার চোখ। কৈশোরে পিতার সঙ্গে হিমালয় ভ্রমণ রবীন্দ্রনাথের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। পাহাড়, আকাশ, বন, নক্ষত্র আর নীরবতার মধ্যে তিনি প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন প্রকৃতির বিশালতা এবং মানুষের ক্ষুদ্রতাকে। পরবর্তী জীবনে তার কবিতা, গান ও দর্শনে প্রকৃতির যে গভীর উপস্থিতি দেখা যায়, তার বীজ রোপিত হয়েছিল এই অভিজ্ঞতার মধ্যেই।তবে ঠাকুরবাড়ির আরেকটি শিক্ষা ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ—মানুষের প্রতি সম্মান। ধর্ম, জাত, ভাষা কিংবা ভৌগোলিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষকে দেখার যে উদার মানসিকতা রবীন্দ্রনাথের রচনায় বারবার ফিরে এসেছে, তারও সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় পারিবারিক পরিবেশে। সেই কারণেই তিনি একদিকে যেমন গভীরভাবে বাঙালি, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বমানবের কণ্ঠস্বর।পরিবার তার কাছে ছিল কেবল রক্তের সম্পর্ক নয়; ছিল মূল্যবোধের বিদ্যালয়। এখান থেকেই তিনি শিখেছিলেন শৃঙ্খলা, শিল্পচেতনা,মানবিকতা, আত্মসমালোচনা এবং স্বাধীন চিন্তার সাহস। এই শিক্ষাই পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনের শিক্ষাদর্শে রূপ নেয়, যেখানে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে গুরুত্ব পায় প্রকৃতি, সৃজনশীলতা এবং মুক্ত চিন্তা।হয়তো এ কারণেই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য এত গভীরভাবে মানবিক। কারণ তিনি শুধু বই থেকে শেখেননি; তিনি শিখেছিলেন জীবন থেকে, পরিবার থেকে, সম্পর্ক থেকে এবং নীরবতা থেকে।

১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর, মাত্র বাইশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয় ভবতারিণী দেবীর সঙ্গে। বিয়ের পর তার নাম রাখা হয় মৃণালিনী দেবী। সে সময়ের সামাজিক রীতিতে অল্প বয়সেই এই বিবাহ সম্পন্ন হলেও সময়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পরিণত হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং নীরব সহযাত্রায়। সাহিত্যচর্চা, জমিদারির দায়িত্ব এবং বহুমুখী কর্মব্যস্ততার আড়ালে সংসারের যে দৃঢ় ভিত্তি গড়ে উঠেছিল, তার বড় অংশই নীরবে বহন করেছিলেন মৃণালিনী দেবী।ইতিহাসে তার নাম খুব বেশি উচ্চারিত হয় না। তিনি কোনো সাহিত্যিক ছিলেন না, কোনো জননেত্রীও নন। তবু রবীন্দ্রনাথের জীবনের ইতিহাস লিখতে গেলে তার নাম এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। কারণ বড় মানুষের জীবনে অনেক সময় সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন সেই মানুষটি, যিনি আলোয় আসেন না।
দাম্পত্যজীবনে তাদের সংসার আলো করে জন্ম নেয় পাঁচ সন্তান—মাধুরীলতা (বেলা), রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা এবং শমীন্দ্রনাথ। একজন পিতা হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন স্নেহশীল, কিন্তু প্রচলিত অর্থে কঠোর অভিভাবক নন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুর মনকে শাসন নয়, বিকাশের সুযোগ দিতে হয়। প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয়, শিল্পচর্চা, স্বাধীন চিন্তা এবং প্রশ্ন করার সাহস—এসবই ছিল তার শিক্ষাদর্শের মূলভিত্তি। পরে শান্তিনিকেতনের শিক্ষাব্যবস্থায় সেই বিশ্বাস বাস্তব রূপ পায়।
কিন্তু নিয়তি যেন তার সংসারের জন্য এক ভিন্ন গল্প লিখে রেখেছিল।১৯০২ সালে মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু ঘটে। জীবনের যে মানুষটি নিঃশব্দে তার পাশে ছিলেন, তিনি হঠাৎই বিদায় নিলেন। এই মৃত্যু শুধু একজন স্ত্রীর মৃত্যু ছিল না; এটি ছিল রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে গভীর শূন্যতাগুলোর একটি।এই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ১৯০৩ সালে কন্যা রেণুকা চলে গেলেন। তারপর ১৯০৫ সালে পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু।১৯০৭ সালে ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথের অকালপ্রয়াণ। পরবর্তীকালে জ্যেষ্ঠ কন্যা মাধুরীলতার মৃত্যুও তাকে গভীরভাবে আঘাত করে। অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে এতগুলো প্রিয়জনকে হারানো যে কোনো মানুষকে ভেঙে দিতে পারত।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক এখানেই!তিনি শোককে অস্বীকার করেননি, আবার শোকের কাছে আত্মসমর্পণও করেননি।তিনি ব্যক্তিগত বেদনাকে কখনো প্রদর্শনের বিষয় বানাননি। বরং সেই বেদনা ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে তার কবিতায়, গানে, প্রবন্ধে এবং দর্শনে। তার রচনায় মৃত্যু কখনো কেবল সমাপ্তি নয়; কখনো তা রূপান্তর, কখনো বিচ্ছেদের মধ্যেও মিলনের আকাঙ্ক্ষা, কখনো জীবনের গভীরতর উপলব্ধি।
রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র পড়লে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—পরিবারের প্রতি তার মমত্ব ছিল অকৃত্রিম। কর্মব্যস্ততার মাঝেও তিনি সন্তানদের শিক্ষা, চরিত্রগঠন এবং মানসিক বিকাশ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। তার কাছে পিতৃত্ব ছিল কেবল অভিভাবকত্ব নয়; ছিল একজন মানুষ গড়ে তোলার দায়িত্ব।
আজকের দিনে আমরা যখন সফলতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করি, তখন প্রায়ই মানুষের পারিবারিক পরিচয়কে তুচ্ছ করে দেখি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবন আমাদের অন্য শিক্ষা দেয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে বিশ্বমানের সাহিত্যিক, সমাজচিন্তক, শিক্ষাবিদ এবং একজন নিবেদিত পারিবারিক মানুষ হতে পারেন। এই পরিচয়গুলো পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরকে সমৃদ্ধ করে।রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য শুধু নন্দনতত্ত্বের চর্চা নয়; এটি জীবনদর্শনের দলিল। তার কবিতায় মৃত্যু ভয়ের প্রতীক নয়, বরং অনিবার্য সত্যের গ্রহণযোগ্যতা। তার গানে বিচ্ছেদ কেবল বেদনা নয়, আত্মার গভীর সংলাপ। তার প্রবন্ধে মানুষ কোনো জাতি, ধর্ম বা ভূখণ্ডের সীমায় আবদ্ধ নয়; মানুষ সেখানে বিশ্বমানবতার অংশ।এ কারণেই গীতাঞ্জলি পড়লে মনে হয়, কবি কেবল ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলছেন না; তিনি নিজের ভাঙা হৃদয়ের সঙ্গেও কথা বলছেন।ডাকঘর-এ শিশুমন যেমন মুক্তির স্বপ্ন দেখে, তেমনি সেখানে জীবনের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার এক আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ পায়। তার বহু গান ও কবিতায় শোক ব্যক্তিগত থেকে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সেখানে আর একার থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রতিটি মানুষের অনুভূতির ভাষা।

রবীন্দ্রনাথের জীবন আমাদের আরও একটি গভীর শিক্ষা দেয়—মহত্ত্ব কখনো কেবল প্রতিভা দিয়ে নির্মিত হয় না; চরিত্র, সহিষ্ণুতা এবং মানবিকতা তাকে পূর্ণতা দেয়। নোবেল পুরস্কার তাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করেছে, কিন্তু তাকে অমর করেছে তার মনুষ্যত্ব। কারণ তার সাহিত্য মানুষের বিভাজন শেখায় না; শেখায় সংযোগ। তিনি সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে এবং মানবিক মর্যাদার পক্ষে কলম ধরেছিলেন।

আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে যতই এগিয়ে যাক, মানুষের ভেতরের একাকীত্ব, ভয়, বিচ্ছিন্নতা এবং মূল্যবোধের সংকট যেন আরও প্রকট হচ্ছে। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন এখানেই।তিনি দেখিয়েছেন, ব্যক্তিগত ক্ষতি মানুষকে নিষ্ঠুর করতেই হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। গভীর শোকও মানুষকে আরও সহানুভূতিশীল, আরও উদার, আরও সৃজনশীল করে তুলতে পারে। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিভার সর্বোচ্চ প্রকাশ তখনই ঘটে, যখন তা মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত হয়।
হয়তো এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ আজও শুধু বাঙালির নন; তিনি বিশ্বের। তার পরিচয় কোনো একটি ভাষা, একটি জাতি বা একটি ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন এক সাহিত্যিক, যার শব্দে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ নিজেদের জীবনের প্রতিধ্বনি খুঁজে পায়।
এই লেখার শুরুতে একটি প্রশ্ন ছিল—আমরা কি রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করি, নাকি শুধু তার খ্যাতিকে?এখন সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আরও স্পষ্ট!কারণ বিশ্বকবি হয়ে কেউ জন্ম নেন না।জীবনসংগ্রামের দীর্ঘ পথ পেরিয়েই তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বকবি।
২২ শ্রাবণে তাই আমাদের শ্রদ্ধা শুধু তার সাহিত্যকেই নয়, তার মানুষটিকেও।
কারণ তার কলম অমর হয়েছে শব্দে, কিন্তু সেই শব্দের জন্ম হয়েছে জীবনের গভীরতম অভিজ্ঞতা থেকে।

রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে পড়ার সময় এসেছে—কবিতা দিয়ে নয়, মানুষ দিয়ে।
সেই মানুষটির নাম—শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

শেয়ার করুন

অন্যান্য সংবাদসমূহ


প্রযুক্তি সহায়তায় BTMAXHOST