-অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান মাসুম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার নাম একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনার পর তাঁর দেশত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, তার প্রভাব এখনো স্পষ্ট। তাই তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরবেন কি না—এই প্রশ্নটি নিছক একজন রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ফিরে আসার ইচ্ছা এবং রাজনৈতিকভাবে স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে আসার সুযোগ এক বিষয় নয়। তাঁর বিরুদ্ধে চলমান ও নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলো, বিচারিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অবস্থান এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল।
তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, আসলে কী চায়?
তরুণদের আকাঙ্ক্ষা কি কেবল সরকার পরিবর্তন?
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতির প্রচলিত সমীকরণকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এই আন্দোলনকে শুধু একটি সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যকে ছোট করে দেখা হবে।
একটি প্রজন্ম দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছে—রাষ্ট্র কি নাগরিকের জন্য, নাকি নাগরিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবানদের জন্য?
তরুণরা চায় এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় কারও অধিকার নির্ধারণ করবে না; যেখানে সরকারি চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা কিংবা প্রশাসনিক সুযোগ পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক আনুগত্যকে যোগ্যতার বিকল্প হতে হবে না। তারা চায় দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ।
সবচেয়ে বড় কথা, তারা ক্ষমতার পরিবর্তনের পাশাপাশি ক্ষমতার সংস্কৃতি পরিবর্তন চায়।
আওয়ামী লীগ কি আবার রাজনীতিতে ফিরতে পারবে?
এখানেই সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্ন।
একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা বা কোনো নেতাকে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশের গণতান্ত্রিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। আবার কোনো রাজনৈতিক দল অতীতে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে বলেই তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বৈধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত হয় না।
রাজনীতিতে ফিরে আসার জন্য প্রয়োজন জনগণের আস্থা অর্জন। আর সেই আস্থা অর্জন করতে হলে অতীতের কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় নিয়ে জনগণের সামনে দাঁড়াতে হবে।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ তাই শুধু শেখ হাসিনার ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করবে না। বরং দলটি তার অতীত মূল্যায়ন করে কতটা আত্মসমালোচনা করতে পারে, নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারে এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেকে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে—তার ওপরও নির্ভর করবে।
শেখ হাসিনা ফিরলে কী হবে?
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হবে। তাঁর সমর্থকেরা এটিকে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখবেন; বিরোধীরা দেখবেন পুরোনো রাজনীতির পুনরাগমনের আশঙ্কা হিসেবে।
কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো ব্যক্তির প্রত্যাবর্তন মানেই অতীতের রাজনীতির প্রত্যাবর্তন নয়।
বাংলাদেশ ২০২৪-এর পর যে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, তা উপেক্ষা করে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। জনগণের প্রত্যাশা বদলেছে, বিশেষ করে তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রত্যাশা বদলেছে।
তাই শেখ হাসিনা যদি কখনো দেশে ফিরে আসেন, তাঁকে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নতুন করে জনগণের কাছে যেতে হবে।
রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত জনগণ
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিক। একজন নেতা ক্ষমতায় এলে তাঁকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে; তিনি চলে গেলে তাঁকে ফিরিয়ে আনা বা প্রতিহত করাই রাজনীতির প্রধান আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাই হয়তো এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো একজন নেতা নির্ধারণ করবেন না। নির্ধারণ করবে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, অবাধ নির্বাচন এবং সচেতন নাগরিক সমাজ।
আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তরুণ প্রজন্ম।
তরুণরা যদি শুধু “কে ক্ষমতায় থাকবে”—এই প্রশ্নে আটকে না থেকে “কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে”—এই প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্রই বদলে যেতে পারে।
শেষ কথা
শেখ হাসিনা ফিরবেন কি না—এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, বাংলাদেশ আর আগের জায়গায় নেই।
যে তরুণ প্রজন্ম রাজপথে নেমে রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্ন করেছে, তাদের প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক শক্তির পক্ষেই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জন করা সহজ হবে না।
শেখ হাসিনা ফিরুন কিংবা না ফিরুন, আওয়ামী লীগ ফিরুক কিংবা না ফিরুক—বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ একটাই:
ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর গণতন্ত্রে যাওয়া।
কারণ আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিচয় কোনো একক নেতা নয়—বাংলাদেশের নাগরিক এবং তার তরুণ প্রজন্ম।