সুলাইমান আহমদ
গ্রামের শেষ মাথার সেই ভাঙা কুঁড়েঘরটার কথা এখনও অনেকেই জানে। যেখানে শীতের সকালে এক বেলা খাবারের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাতত এক কিশোর। নাম তার রশিদ। মানুষের দয়া-দাক্ষিণ্যে কোনোমতে দিন চলত। গ্রামের সম্মানিত শিক্ষক কাশেম স্যার তাকে কত দিন নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।
কিন্তু সময় মানুষকে অদ্ভুতভাবে বদলে দেয়।
ভাগ্যের চাকা ঘুরল কয়েক বছর পর। বিদেশে গিয়ে হঠাৎ এক অনৈতিক উপায়ে কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক হয়ে গেল রশিদ। গ্রামে ফিরল সে এক অন্য মানুষ হয়ে—টাকার গরমে মাথা উঁচু, চোখে অহংকারের অন্ধত্ব। অতীতে যে সে মানুষের বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে চলত, সেই অতীত যেন তার মন থেকে একদম মুছে গেল। নিজেকে যেন এলাকার সর্বেসর্বা মনে করতে লাগল।
অহংকারের বশে রশিদ ভুলে গেল অতীত, ভুলেই গেল যে সম্মান দেওয়া কিংবা কেড়ে নেওয়ার মালিক উপরওয়ালা।
একদিন গ্রামের একটি জনসভায় বয়োবৃদ্ধ কাশেম স্যার গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য সামান্য কিছু অনুদান চাইলেন। রশিদ সেখানে দাঁড়িয়ে সবাইকে শুনিয়ে কাশেম স্যারকে অপমান করে বলল,
“টাকা চাওয়া যাদের স্বভাব, তাদের সম্মান নিয়ে কথা বলা মানায় না! আপনি ভিক্ষা চাওয়া বন্ধ করুন, শিক্ষক মানুষ বলে রেহাই পাচ্ছেন।”
কাশেম স্যার স্তব্ধ হয়ে গেলেন। কোনো উত্তর না দিয়ে চোখের পানি মুছে চুপচাপ হেঁটে বিদায় নিলেন। রশিদের অহংকার তখন চরমে। সে ভেবেছিল স্যারকে ছোট করে সে নিজে অনেক বড় হয়ে গেল! কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল, অপরের সম্মান নষ্ট করতে গিয়ে নিজের গর্ত নিজেই খুঁড়ছে সে।
ফেরাউন যেমন নিজের শক্তি ও বাহিনীর অহংকারে মগ্ন হয়ে হযরত মুসা (আঃ)-কে ধ্বংস করতে গিয়ে নীল নদের অতল জলে ডুবে মরেছিল, ঠিক তেমনি অহংকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার সময় এল রশিদের।
কয়েক মাসের মধ্যেই রশিদের অবৈধ ব্যবসার থলে টান পড়ল। একের পর এক লোকসান, আইনশৃঙ্খলার বাঁধন আর সহযোগীদের প্রতারণায় মুহূর্তের মধ্যে দেউলিয়া হয়ে গেল সে। টাকা-পয়সার সাথে সাথে শেষ হয়ে গেল তার ক্ষমতার বাহাদুরি।
একদিন দেনার দায়ে রশিদের সমস্ত সম্পত্তি নিলামে উঠে গেল। পাওনাদারদের ভয়ে রাতের অন্ধকারে যখন সে এলাকা ছেড়ে পালাতে চাইল, তখন গ্রামের মোড়েই ধরা পড়ে গেল। ধিক্কার আর অপমানে জর্জরিত হয়ে যখন সে ধুলোয় মুখ লুকিয়ে কান্নাকাটি করছিল এবং সবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছিল—তখন আর কেউ তাকে বিশ্বাস করল না, কারো মনে তার জন্য দয়া জাগল না।
নীল নদের পানিতে ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে ফেরাউনের ইমান যেমন কোনো কাজে আসেনি, তেমনি পতনের পর রশিদের এই অসার অনুশোচনা ও চিৎকারও তার হারিয়ে যাওয়া সম্মান আর অবস্থান ফিরিয়ে দিতে পারল না। অহংকার তাকে আবার সেই ধুলোতেই মিশিয়ে দিল, যেখান থেকে সে উঠে এসেছিল।