উপসম্পাদকীয়॥ রেহানা ফেরদৌসী
একটি দেশের সম্প্রীতি কতটা গভীর, তার পরীক্ষা উৎসবের আলোকসজ্জায় নয়—ভিন্ন ধর্মের মানুষ কতটা নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের বিশ্বাস পালন করতে পারছেন, তার মধ্যেই। ঢাকের বোল আর প্রার্থনার ধ্বনি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো বিভাজন থাকতে পারে না।
শরতের বাতাসে শিউলির সুবাস, কাশফুলের দোল আর মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বোল—সব মিলিয়ে বাংলার প্রকৃতিতে জেগে ওঠে শারদীয়ার আবহ। প্রতিমায় শেষ তুলির টান পড়ার সঙ্গে শুরু হয় দেবী দুর্গার আগমনের প্রতীক্ষা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গাপূজা গভীর বিশ্বাস ও ভক্তির উৎসব। একই সঙ্গে এ উৎসব বাংলার সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনে পারস্পরিক সৌহার্দ্যেরও এক বিশেষ উপলক্ষ।
বাংলাদেশের বহুধর্মীয় সমাজে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। দুর্গাপূজার মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা তৈরি, আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থায় নানা সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ এই বন্ধনের পরিচয় বহন করে। ঈদে শুভেচ্ছা বিনিময় কিংবা পূজায় প্রতিবেশীর আনন্দে শরিক হওয়ার মধ্যেও প্রকাশ পায় মানবিক সম্পর্কের শক্তি। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা শুধু সামাজিক সৌজন্যের বিষয় নয়, আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
দেবী দুর্গার অসুরবধ অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। এর সামাজিক তাৎপর্যও স্পষ্ট—মানুষের প্রকৃত প্রতিপক্ষ ভিন্ন ধর্মের মানুষ নন বরং ঘৃণা, হিংসা, অহংকার ও অসহিষ্ণুতা। নিজের বিশ্বাসে অবিচল থাকা এবং অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করা পরস্পরবিরোধী নয়। ধর্মীয় সম্প্রীতির ভিত্তি অভিন্ন বিশ্বাস নয়, বরং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা স্বীকার করা।
এই স্বীকৃতির বাস্তব প্রমাণ দিতে হয় আচরণে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যের উপাসনায় বিঘ্ন না ঘটানো এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা নাগরিক দায়িত্বের অংশ। প্রত্যেক মানুষের নিরাপদে নিজ নিজ ধর্ম পালন করার অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সেই অধিকার সুরক্ষিত করতে হবে,পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সম্প্রীতির পথে বড় বাধা হলো গুজব, বিদ্বেষ ও উসকানি। তাই তথ্য যাচাই ছাড়া প্রচার না করা, উসকানিমূলক বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নেওয়া জরুরি। সম্প্রীতি রক্ষায় নীরব দর্শক হয়ে থাকা নয়, ন্যায়ের পক্ষে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখাই কাম্য।
এই দায়বোধের শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত। সন্তানদের শেখাতে হবে, নিজের ধর্মের প্রতি ভালোবাসা অন্যের ধর্মকে অবজ্ঞা করার অনুমতি দেয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা জোরদার করতে হবে। কারণ বিভাজন দূর করার জন্য শুধু সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়,প্রয়োজন সচেতনতা, ন্যায়বোধ ও দায়িত্বশীল আচরণ।
একটি উৎসবের সার্থকতা শুধু আলোকসজ্জা, আয়োজন কিংবা মানুষের উপস্থিতিতে নির্ধারিত হয় না। এর সার্থকতা নির্ভর করে মানুষ কতটা নিরাপদে উৎসব পালন করতে পারছেন, তাদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকছে এবং সমাজে পারস্পরিক আস্থা কতটা অটুট থাকছে, তার ওপর। কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ যদি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয় বা বৈষম্যের মুখোমুখি হন, তবে সেই সমাজের সম্প্রীতি এখনো পূর্ণতা পায়নি।
এই শারদীয়ায় আমাদের অঙ্গীকার হোক—ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানুষের মর্যাদা রক্ষায় আপসহীন থাকব, গুজব ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সচেতন থাকব এবং ভিন্নতাকে বিভাজনের কারণ হতে দেব না। কারণ উৎসবের আনন্দ সাময়িক, কিন্তু একটি সমাজের মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় প্রকাশ পায় তার প্রতিদিনের আচরণে।
মণ্ডপের আলো নয়, মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তাই সম্প্রীতির প্রকৃত পরীক্ষা। যে দেশে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে পাশাপাশি বাঁচতে পারেন, সেই দেশই প্রকৃত অর্থে সমৃদ্ধ।
উৎসবের সৌন্দর্য সম্প্রীতিতে, বিভাজনে নয়—এই হোক আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার।