প্রধানমন্ত্রীর ক্লিয়ার মেসেজ সরকারের তোষামোদ নয়, সত্যকে সত্য হিসেবেই জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা সাধারণত নির্বাচন, সংসদ, বিচারব্যবস্থা কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকাই। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আরেকটি শক্তিশালী স্তম্ভ রয়েছে, যা রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মকাণ্ডকে জনগণের সামনে তুলে ধরে, ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে, ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে এবং জনগণের কণ্ঠস্বরকে রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেয়। সেই স্তম্ভের নাম গণমাধ্যম।
সোমবার (১৫ জুন) দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বার্তা সম্পাদকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে যে বক্তব্য উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের তোষামোদ নয়, সত্যকে সত্য হিসেবেই জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন, যেখানে সত্যকে আড়াল করার পরিবর্তে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহসকে উৎসাহিত করা হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সমালোচনা কখনো শত্রুতা নয়। বরং গঠনমূলক সমালোচনাই একটি সরকারকে আরও কার্যকর, আরও জনমুখী এবং আরও জবাবদিহিমূলক হতে সহায়তা করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব রাষ্ট্রে স্বাধীন গণমাধ্যম বিকশিত হয়েছে, সেসব রাষ্ট্রে দুর্নীতি কমেছে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বেড়েছে এবং নাগরিক অধিকার আরও শক্তিশালী হয়েছে। অন্যদিকে, যেখানে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত হয়েছে বা ভয়ভীতির সংস্কৃতিতে পরিচালিত হয়েছে, সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে এবং জনগণ বাস্তব তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাত গত দুই দশকে অভূতপূর্ব বিস্তার লাভ করেছে। টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে, অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রসার ঘটেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন যোগাযোগ সংস্কৃতি তৈরি করেছে। কিন্তু এই বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি হয়েছে। তথ্যের গতি বেড়েছে, কিন্তু সব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ভুয়া খবর, অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। ফলে পেশাদার সাংবাদিকতার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—গণমাধ্যম কি সরকারের বন্ধু, নাকি সমালোচক? প্রকৃতপক্ষে গণমাধ্যম কোনোটিই নয়। গণমাধ্যমের একমাত্র দায়িত্ব জনগণের প্রতি। জনগণকে সঠিক তথ্য দেওয়া, জনগণের পক্ষে প্রশ্ন করা এবং জনস্বার্থ রক্ষা করাই সংবাদমাধ্যমের প্রধান কাজ। সরকার যদি ভালো কাজ করে, গণমাধ্যম তা তুলে ধরবে। আবার কোথাও ব্যর্থতা, দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা থাকলে সেটিও প্রকাশ করবে। এটাই সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং পেশাগত দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো তিনি গণমাধ্যমকে ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে দেখেছেন। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের চিন্তার পরিবর্তন, সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ, মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের প্রসার। এসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের প্রভাব অত্যন্ত গভীর।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাত এখনও বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। সাংবাদিকদের চাকরির অনিশ্চয়তা, ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের জটিলতা, পেশাগত নিরাপত্তার অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে মালিকানাগত প্রভাব স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন সাংবাদিক যদি প্রতিনিয়ত চাকরি হারানোর শঙ্কায় থাকেন, তাহলে তার পক্ষে নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
বৈঠকে গণমাধ্যম কমিশন গঠনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একটি স্বাধীন ও কার্যকর গণমাধ্যম কমিশন সময়ের দাবি। তবে কমিশন গঠনই শেষ কথা নয়; এর কাঠামো, দায়িত্ব, জবাবদিহিতা এবং কার্যক্রম হতে হবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। যদি কমিশন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি পেশাগত মানোন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
আজকের বিশ্বে গণমাধ্যম শুধু সংবাদ প্রচারের মাধ্যম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পখাত। টেলিভিশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল কনটেন্ট, বিজ্ঞাপন শিল্প এবং প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে গণমাধ্যম এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে এই খাতকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা প্রদান সময়ের দাবি। কারণ একটি আর্থিকভাবে শক্তিশালী গণমাধ্যমই স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রে সরকারের শক্তি এবং গণমাধ্যমের শক্তি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বরং উভয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ। সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, আর গণমাধ্যম সেই পরিচালনার ওপর জনগণের পক্ষে নজরদারি করবে। এই সম্পর্ক যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তাহলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে দেখা যায়, সরকার ও গণমাধ্যমের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সত্য প্রকাশের অধিকারকে সম্মান করা হয়। কারণ সত্য কখনো রাষ্ট্রের শত্রু নয়। সত্য রাষ্ট্রকে ভুল থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করে, নীতিনির্ধারণকে বাস্তবমুখী করে এবং জনগণের আস্থা বাড়ায়। তাই সত্যকে আড়াল করার চেয়ে সত্যকে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই উন্নত রাষ্ট্রচিন্তার পরিচায়ক।
বাংলাদেশ আজ এক নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দেশের সামনে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রা টেকসই করতে হলে সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আর এই তিনটি ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বক্তব্য নয়; এটি একটি বৃহত্তর বার্তা—রাষ্ট্র সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতা চায়, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম চায় এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে সংবাদমাধ্যমকে দেখতে চায়। এখন প্রয়োজন সেই বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন। প্রয়োজন সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে সংবাদমাধ্যম সরকারকে ভয় পাবে না, আবার সরকারও সংবাদমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ মনে করবে না। যেখানে সত্য প্রকাশ করা হবে সাহসের সঙ্গে, সমালোচনা গ্রহণ করা হবে উদারতার সঙ্গে এবং জনগণের স্বার্থই হবে সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতির অগ্রগতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সত্য। আর সেই সত্যকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ গণমাধ্যম।
–রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
☞বিশিষ্ট লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
১৬:০৬:২০২৬ ইং