লেখাঃরেহানা ফেরদৌসী
ঢাকা, ১৬জুন’২৬
ভোরে জানালা খুলতেই ভেসে আসলো ভেজা মাটির গন্ধ। দূরের আকাশে কালো মেঘ জমে আছে। গাছের পাতায় টুপটাপ পানি। কোথাও হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, কোথাও বজ্রের গর্জন। রাত বাড়লে টিনের চালে ঝমঝম শব্দ, অন্ধকারে বিদ্যুতের ঝলকানি, দূরে ব্যাঙের ডাক। এভাবেই শুরু হয় বাংলা বর্ষার সবচেয়ে অনুভূতিময় ঋতু— আষাঢ়।
আজ পহেলা আষাঢ়। বাংলা বর্ষার প্রথম দিন। গ্রীষ্মের দীর্ঘ দাবদাহ আর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের অস্থিরতার পর প্রকৃতি যেন নতুন করে শ্বাস নিতে শুরু করে। বর্ষা আসে শুধু আকাশে নয়, মানুষের জীবনেও। কৃষকের মাঠে, শহরের রাস্তায়, কিশোরীর রঙিন ছাতায়, চায়ের দোকানের আড্ডায়, হাসপাতালের ওয়ার্ডে— সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে বর্ষার প্রভাব।বর্ষা বাঙালির কাছে একইসঙ্গে কবিতা, কৃষি, দুর্ভোগ, প্রেম ও বাস্তবতার নাম।
বর্ষার তিনটি মুখ।বর্ষার সকাল সাধারণত কোমল। সূর্য লুকিয়ে থাকে মেঘের আড়ালে, তবু আলো থাকে। বাতাসে কদম ফুলের ঘ্রাণ, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। গ্রামের সরু কাঁচা পথে জমে থাকা পানিতে ছপছপ শব্দ তুলে হাঁটে মানুষ। শহরের ধুলো ধুয়ে গিয়ে বাতাস কিছুটা নির্মল হয়।
দুপুর গড়াতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। কালো মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। হঠাৎ শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। অনেক এলাকায় মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বৃষ্টিতেই হাঁটুপানি জমে যায়। বাস থেমে থাকে, রিকশার হুড নেমে আসে, ফুটপাতের দোকানদার তড়িঘড়ি পলিথিন টাঙায়।
চায়ের দোকানগুলো তখন ভরে ওঠে মানুষের ভিড়ে। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর বৃষ্টির শব্দ— এ যেন শহুরে জীবনের এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া।
রাতের বর্ষা আবার ভিন্ন অনুভূতির। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন ছন্দ তোলে। বিদ্যুতের ঝলকানি অন্ধকার আকাশকে মুহূর্তে আলোকিত করে। গ্রামে কোথাও হারিকেন জ্বলে, কোথাও লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ছাদে জমে ওঠে গল্প।
বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে বর্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আষাঢ়-শ্রাবণ মানেই আমন ধানের বীজতলা তৈরির মৌসুম। মাঠে পর্যাপ্ত পানি না এলে ফসল বিপন্ন হয়।বর্ষার পানিতে বিল-হাওর ভরে ওঠে। মাছের প্রজনন বাড়ে। শুকিয়ে যাওয়া খাল-বিল আবার প্রাণ ফিরে পায়। প্রকৃতির সঙ্গে জড়িত মানুষের কাছে বর্ষা মানেই নতুন সম্ভাবনা।কৃষিবিদদের মতে, সময়মতো বৃষ্টি না হলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। আবার অতিবৃষ্টিও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বর্ষা এখন আশীর্বাদের পাশাপাশি অনিশ্চয়তারও প্রতীক।
যেখানে কৃষকের জন্য বর্ষা স্বস্তি, শহুরে মানুষের জন্য অনেক সময় তা ভোগান্তির কারণ। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সামান্য বৃষ্টিতেই তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। নিচু এলাকার সড়ক তলিয়ে যায়। অফিসগামী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়।নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল হওয়া খাল এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বর্ষাকাল এখন শহুরে দুর্ভোগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দিনমজুর ও রিকশাচালকদের আয়ও কমে যায় টানা বৃষ্টিতে। রাস্তায় মানুষ কম বের হওয়ায় তাদের জীবিকায় সরাসরি প্রভাব পড়ে।
বর্ষা মানেই বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে অন্যরকম উচ্ছ্বাস। গরম খিচুড়ি, ইলিশ মাছ, ডিম ভুনা, পেঁয়াজু, বেগুনি আর ধোঁয়া ওঠা চা— বৃষ্টির দিনে যেন এগুলোর স্বাদ আরও বেড়ে যায়।পদ্মার ইলিশের চাহিদাও এ সময় বাড়ে। বাজারে বাড়ে বিভিন্ন ভাজাপোড়ার বিক্রি। বৃষ্টির দিনে রাস্তার পাশের চপের দোকানগুলোতে দেখা যায় দীর্ঘ লাইন।পুষ্টিবিদদের পরামর্শ, বর্ষায় খাবার ও পানির বিষয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এ সময় দূষিত পানি থেকে ডায়রিয়া ও টাইফয়েডের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বর্ষা বদলে দেয় মানুষের পোশাকও। ভারী কাপড়ের বদলে আসে পাতলা সুতি, তাঁত কিংবা দ্রুত শুকায় এমন কাপড়। রঙিন ছাতা, রেইনকোট, স্যান্ডেল ও জলরোধী ব্যাগ হয়ে ওঠে নিত্যদিনের সঙ্গী।
ফ্যাশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষার ফ্যাশনে “ফাংশনাল স্টাইল” জনপ্রিয় হয়েছে। এখন পোশাকে শুধু সৌন্দর্য নয়, আরাম ও ব্যবহারিক দিকও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বর্ষার সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো স্বাস্থ্যঝুঁকি। জমে থাকা পানিতে জন্ম নেয় এডিস মশা। ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সাধারণত জুলাই-আগস্টে বাড়তে শুরু করে।এছাড়া সর্দি-জ্বর, চর্মরোগ, ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ পানিবাহিত রোগও বেড়ে যায় বর্ষাকালে। চিকিৎসকরা বলছেন, ফুটানো পানি পান করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলা জরুরি।
গ্রামীণ এলাকায় সাপের উপদ্রবও বাড়ে এ সময়। বন্যা বা অতিবৃষ্টিতে অনেক সময় সাপ লোকালয়ে চলে আসে।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বর্ষার অবস্থান চিরন্তন। রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুলের কবিতা, জীবনানন্দের প্রকৃতিচিত্র— সবখানেই ফিরে এসেছে আষাঢ়ের মায়া।
“বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল” কিংবা “আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে”— এসব গান শুধু সংগীত নয়, বর্ষার আবেগেরই আরেক রূপ।স্কুলফেরত শিশুর কাগজের নৌকা, বৃষ্টিভেজা বিকেলে মায়ের ডাকা, ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখা— বর্ষা মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতিকেও নাড়া দেয় গভীরভাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে বর্ষার চরিত্র।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের বর্ষার ধরণ বদলে যাচ্ছে। আগের মতো দীর্ঘ সময় ধরে মৃদু বৃষ্টি না হয়ে এখন কম সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ফলে আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার ঘটনা বাড়ছে।আবার অনেক এলাকায় সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষিকাজেও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। ফলে বর্ষা এখন শুধু ঋতু নয়, পরিবেশগত পরিবর্তনেরও একটি বড় ইঙ্গিত।
আষাঢ়-শ্রাবণ মিলিয়ে এই ৬০ দিনের ঋতুতে আছে একসঙ্গে সৌন্দর্য ও সংগ্রাম। কোথাও কদম ফুল ফুটে, কোথাও হাঁটুপানি জমে। কোথাও খিচুড়ির গন্ধ, কোথাও হাসপাতালের লম্বা লাইন।
তারপরও বাঙালি বর্ষাকে ভালোবাসে। কারণ এই জলই মাঠে ধান ফলায়, নদী ভরায়, প্রকৃতিকে সবুজ করে তোলে।
আজ রাতে একবার জানালার পাশে দাঁড়ান। হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁয়ে দেখুন। মনে হবে— বর্ষা আসলে শুধু একটি ঋতু নয়, এটি বাংলার প্রাণের স্পন্দন।