লিবিয়ার বেনগাজীতে দূতাবাসের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত:
লিবিয়ার বেনগাজী ও পূর্বাঞ্চলে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের সার্বিক কল্যাণ ও সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ দূতাবাস, গতকাল রোজ রবিবার ১৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে বেনগাজীস্থ মা’হাদ নাজী আল-ফোনাস অডিটোরিয়ামে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লিবিয়ায় নিযুক্ত মান্যবর রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত মুহাম্মদ খায়রুল বাশার। এছাড়াও সভায় লিবিয়ার কন্স্যুলার বিভাগের পরিচালক এবং দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) উপস্থিত ছিলেন। সভায় মান্যবর রাষ্ট্রদূত প্রবাসীদের মতামত গ্রহণের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের চলমান উদ্যোগসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করেন।
মতবিনিময় সভায় মান্যবর রাষ্ট্রদূত প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বর্তমান বাংলাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ডাকযোগে ভোটদান ব্যবস্থা (Postal Vote) চালু করতে যাচ্ছে, যা প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আগামী ১৮ নভেম্বর “Postal Vote BD” অ্যাপ উদ্বোধনের পর বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্রধারী সকল প্রবাসী নিজ অবস্থান থেকেই ভোট প্রদান করতে পারবেন। রেজিস্ট্রেশন, ব্যালট গ্রহণ, ভোট প্রদান এবং ব্যালট ফেরত পাঠানোর প্রতিটি ধাপ তিনি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন। মান্যবর রাষ্ট্রদূত উপস্থিত প্রবাসীদের এই জাতীয় দায়িত্ব পালনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
সভায় লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল, বিশেষত বেনগাজী থেকে স্বেচ্ছায় দেশে প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। আইওএম বেনগাজী অফিসে জমাকৃত পাসপোর্টের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং লিবিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে দূতাবাসের নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়টি মান্যবর রাষ্ট্রদূত সকলকে অবহিত করেন। তিনি আইওএম ও লিবিয়ান কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে নিবন্ধিত অভিবাসীদের আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই দেশে প্রেরণের উদ্যোগের কথা জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দূতাবাসের নিরলস প্রচেষ্টায় গত দুই বছরে ৭১৭১ জন বাংলাদেশিকে বিপদগ্রস্ত অবস্থা থেকে দেশে পাঠানো হয়েছে এবং এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও আগামী ১৭ নভেম্বর গানফুদা ডিটেনশন সেন্টার থেকে ১৭৫ জন এবং ৩০ নভেম্বর তাজুরা ডিটেনশন সেন্টার থেকে আরও ১৭৫ জন অভিবাসীকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
এর পাশাপাশি মান্যবর রাষ্ট্রদূত লিবিয়ায় ই-পাসপোর্ট সিস্টেম চালুর অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, ই-পাসপোর্টের সকল যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে দূতাবাসে পৌঁছেছে এবং বাংলাদেশ থেকে টেকনিক্যাল টিম এলেই কার্যক্রম শুরু হবে। শুরুতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আবেদন গ্রহণ করা হবে, বিশেষত যাদের পাসপোর্ট হারিয়েছে বা যাদের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষের পথে—তাদের আবেদন আগে গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।
সভায় প্রবাসীদের নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ, সার্বজনীন প্রবাসী পেনশন স্কিম, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মেম্বারশিপ এবং বৈধ রেমিট্যান্স প্রেরণের গুরুত্ব সম্পর্কেও রাষ্ট্রদূত মহোদয় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি হুন্ডি পরিহারের পরামর্শ দিয়ে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণে উৎসাহিত করেন এবং দেশের অর্থনীতিতে গর্বিত অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি ও ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে সকলকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে মান্যবর রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। মান্যবর রাষ্ট্রদূত মতবিনিময় সভার সার্বিক আয়োজনে সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
উক্ত সভায় লিবিয়ার কনসুলার বিভাগের পরিচালক বলেন, বাংলাদেশি অভিবাসীরা লিবিয়া পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার; সুতরাং তাদের যেকোনো সমস্যা সমাধান এবং প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
মান্যবর রাষ্ট্রদূতের এটি বেনগাজীতে শেষ সফর হওয়ায় সভা শেষে পূর্বাঞ্চলে প্রবাসীদের জন্য তাঁর আন্তরিক সেবা ও অবদানকে স্বীকৃতি জানিয়ে স্থানীয় প্রবাসীরা তাঁর হাতে একটি সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন। এ সময় তারা দূতাবাসের সেবা প্রবাসীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য মান্যবর রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।