মাইনুল হক মেনু, স্টাফ রিপোর্টার :
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বসেছে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দেশের একমাত্র ঢাক-ঢোলের হাট। বৃহস্পতিবার দুপুরে কটিয়াদী পুরাতন বাজারে বসা তিন দিনব্যাপী এই ঐতিহ্যবাহী হাট পরিদর্শন করেছেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন। এ সময় তিনি হাটে আসা ঢাক-ঢোল, সানাই, বাঁশি, কাঁসি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের শিল্পী, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। হাটে শৌচাগার নির্মাণের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কটিয়াদী উপজেলা সদরের পুরাতন বাজাওে কটিয়াদী প্রেসক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা অফিসসংলগ্ন এলাকায় ঐতিহ্যবাহী এই হাট পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্যের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কটিয়াদী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র তোফাজ্জল হোসেন খান দিলীপ, সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান কাঞ্চন, কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ডা. জহর লাল সাহা, সহসভাপতি মিজানুর রহমান স্বপন, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জায়দুল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মিটু ও শামসুল হক চান মিয়া, শফিকুল ইসলাম ফুলু, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. খলিলুর রহমান খলিল ও হাজী মোহাম্মদ আলী, উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম সেতু, কটিয়াদী উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সদস্য সচিব বিপ¬ব চন্দ্র রায় নিমাই সহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা।
পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, কটিয়াদীর ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাক-ঢোলের হাট দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং হাটে আসা বাদ্যযন্ত্রীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। হাটে কোনো পাবলিক শৌচাগার না থাকায় শৌচাগার নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আগের বছরগুলোতে পূজা উপলক্ষে ৫০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হলেও এ বছর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দ দিয়েছে। এ ছাড়া পূজা উপলক্ষে ছুটি বাড়ানো এবং দরিদ্র ও অসহায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শাড়িসহ অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। কালের পরিক্রমায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও কটিয়াদীর এই ঢাক-ঢোলের হাট তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। তিনি আরও বলেন, দুর্গাপূজার আগে কয়েক দিনের জন্য বসা এই হাট শুধু বাদ্যযন্ত্র ভাড়া নেওয়া ও দেওয়ার স্থান নয়, এটি দেশের লোকজ সংস্কৃতি, বাদ্যসংগীতের ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পীদের পারস্পরিক যোগাযোগের এক অনন্য মিলনকেন্দ্র।
প্রতি বছরের মতো এবারও বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী বসেছে কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাক-ঢোলের হাট। দুর্গাপূজার আগে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাক, ঢোল, সানাই, বাঁশি, কাঁসি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র নিয়ে শিল্পীরা এখানে জড়ো হন। পূজামণ্ডপের আয়োজকেরা তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী বাদ্যযন্ত্রীদের সঙ্গে দরদাম করে ভাড়ায় নেওয়ার জন্য চুক্তি করেন।
হাটজুড়ে বাদ্যযন্ত্রীদের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার দৃশ্য তৈরি করে উৎসবমুখর পরিবেশ। ঢাকের বাদ্য, বাঁশির সুর আর শিল্পীদের নানা ভঙ্গিতে পরিবেশিত বাদ্যসংগীতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। শুধু কেনাবেচা নয়, এই হাট বিভিন্ন অঞ্চলের বাদ্যযন্ত্রীদের মিলনমেলা হিসেবেও পরিচিত।
এ বছর একটি ঢাক ১২ থেকে ২০ হাজার টাকা, ঢোল ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা এবং প্রকারভেদে বাঁশি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় ভাড়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। ছোট ব্যান্ড পার্টির ভাড়া ২০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা এবং বড় ব্যান্ড পার্টির ভাড়া ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। বাদ্যযন্ত্রের ধরন, শিল্পীর সংখ্যা ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভাড়ার তারতম্য হতে পারে।
জনশ্রুতি রয়েছে কটিয়াদী উপজেলা সদর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তরে চারিপাড়া গ্রামে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের রাজপ্রাসাদ ছিল। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিনি তাঁর রাজপ্রাসাদে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। পূজা উপলক্ষে ঢাক-ঢোল, বাঁশি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানাতে রাজপ্রাসাদ থেকে তৎকালীন বিক্রমপুর, মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বার্তা পাঠানো হতো। তখন নৌপথে যাতায়াতের প্রচলন ছিল। বাদ্যযন্ত্রীরা পূজার দুই-তিন দিন আগে কটিয়াদী-মঠখোলা সড়কের পাশে পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে যাত্রাঘাট নামের স্থানে এসে পৌঁছাতেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বাদ্যযন্ত্রীদের সমাগমকে কেন্দ্র করে হাটের প্রচলন গড়ে ওঠে বলে স্থানীয়ভাবে জনশ্রুতি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী মসুয়া গ্রামে বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ হরিকিশোর রায় চৌধুরীর বাড়িতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হতো। পূজার পাশাপাশি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের প্রতিযোগিতাও চলত। সময়ের সঙ্গে পূজার আয়োজন বাড়তে থাকায় বিভিন্ন জমিদারের মধ্যে ঢাকের হাটের স্থান নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। পরে যাত্রাঘাট থেকে হাটটি স্থানান্তর করে কটিয়াদী পুরাতন বাজারে নিয়ে আসা হয় বলে স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে। বর্তমানে কটিয়াদী প্রেসক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা অফিসসংলগ্ন এলাকায় এই হাট বসে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা এই আয়োজন স্থানীয় ইতিহাস, ধর্মীয় উৎসব ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।
কটিয়াদীর এই হাটে প্রতিবছর বৃহত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাদ্যযন্ত্রীরা আসেন। দুর্গাপূজার এক-দুই দিন আগে বিভিন্ন পূজামণ্ডপের আয়োজকেরা হাটে এসে তাঁদের পছন্দমতো শিল্পীদের ভাড়ায় নেওয়ার জন্য বায়না করেন। পরে এসব শিল্পী পূজামণ্ডপে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দর্শনার্থী ও ভক্তদের আনন্দ দেন।
কটিয়াদী উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সদস্য সচিব বিপ¬ব চন্দ্র রায় নিমাই বলেন, ঢাক-ঢোলের হাট হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাদ্যযন্ত্রীরা এখানে আসেন। তাঁদের দেখাশোনা ও সার্বিক তদারকি করা হচ্ছে। হাটে অস্থায়ী মনিটরিং কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই হাটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাক-ঢোল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের শিল্পীরা আসায় এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আগত শিল্পী ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করছে।