নিজস্ব প্রতিবেদক
ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সকাল ৯টা। শত বছরের ঐতিহ্য মেনে শটগানের শেষ গুলির আওয়াজের পরেই শুরু হলো কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের পবিত্র ঈদুল আজহার ১৯৯তম জামাত। ইমামের কণ্ঠে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে মুসল্লিরা নিয়ত বাঁধলেন। কিন্তু প্রথম রাকাত শেষ করে যখন দ্বিতীয় রাকাতের প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই আকাশের মেঘ ভেঙে নামল মুষলধারে ঝুম বৃষ্টি।
হঠাৎ প্রকৃতির এমন হানায় এক মুহূর্তের জন্যও ভাঙেনি মুসল্লিদের কাতার। মাথায় ছাতা কিংবা পলিথিন, আবার কারও কারও শরীর সম্পূর্ণ ভিজে একাকার; কিন্তু মাঠ ছাড়েননি একটি মানুষও। নরসুন্দা নদীর তীরের এই প্রাচীন পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা পরম ধৈর্য ও ভক্তিতে বৃষ্টির মাঝেই শেষ করেন ঈদের নামাজ। নামাজ শেষে ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ যখন দেশ ও মুসলিম উম্মাহর সমৃদ্ধি কামনায় মোনাজাত শুরু করেন, তখন বৃষ্টির জলের সাথে মুসল্লিদের চোখের জল মিশে একাকার হয়ে যায়।
কোরবানির ঈদের ঘরোয়া ব্যস্ততা এবং সকালের গুমোট আবহাওয়া উপেক্ষা করে যারা দূর-দূরান্ত থেকে এসেছিলেন, এই বৃষ্টি যেন তাদের ঈদের স্মৃতিকে আরও স্মরণীয় করে রাখল। গাইবান্ধা থেকে আসা মধ্যবয়সী মুসল্লি রফিকুল ইসলাম (৪৫) গা ভেজা অবস্থায় হাসিমুখে বলছিলেন, কোরবানির ঈদে সকালে ঘরে কত কাজ থাকে তা তো সবাই জানে। সব ফেলে শোলাকিয়ার টানে গতকাল রাতে আসছিলাম। নামাজের এক রাকাত হওয়ার পর যখন ঝুম বৃষ্টি নামল, ভাবলাম এটা আল্লাহর রহমত। একটা মানুষও কাতার ছেড়ে নড়েনি, আমিও দাঁড়িয়ে রইলাম। এই ভিজা গায়ে নামাজ পড়ার শান্তি সারাজীবন মনে থাকবে।
নেত্রকোনা থেকে আসা তরুণ মুসল্লি সাকিব আহমেদ রোমাঞ্চিত কণ্ঠে বলেন, বাড়িতে কোরবানি আছে, দ্রুত ফিরতে হবে। তবে আজকের এই অভিজ্ঞতা অদ্ভুত! প্রথম রাকাত নির্বিঘ্নে পড়লাম, আর দ্বিতীয় রাকাতের সময় শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি। শোলাকিয়ায় নামাজ পড়ার ইচ্ছা ছিল, আর প্রকৃতি সেটাকে স্মরণীয় করে দিল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় কোনো কমতি ছিল না। র্যাব, পুলিশ ও দুই প্লাটুন বিজিবিসহ পুরো মাঠজুড়ে ছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। সকাল ৭টা থেকেই মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করানো হয়।
নামাজ শেষে মাঠের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা বৃষ্টিতে ভিজেই দায়িত্ব পালন করেছেন। মুসল্লিদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সফল হয়েছি। সবাইকে ঈদ মোবারক।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: ইশতিয়াক ইমন বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, মেডিকেল টিম, ফায়ার সার্ভিস ও স্কাউটস সদস্যরাসহ সকলেই সার্বক্ষণিক সেবা দিয়ে গেছেন। সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে এই ঐতিহাসিক জামাত সফল করায় সবাইকে ধন্যবাদ। ঈদ মোবারক।
নামাজ শুরুর ৫ মিনিট আগে শটগানের ৩টি, ৩ মিনিট আগে ২টি এবং ১ মিনিট আগে ১টি গুলির আওয়াজ করে মুসল্লিদের সংকেত দেওয়া হয়। আর শেষ সংকেতের পর শুরু হয় নামাজ।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ ঈদের জামাতের মোনাজাতে প্রাচুর্য প্রকাশে ‘সোয়া লাখ’ কথাটি ব্যবহার করতেন। অন্য একটি মতে, সেই দিনের জামাতে ১ লাখ ২৫ হাজার অর্থাৎ, সোয়া লাখ লোক জমায়েত হয়। ফলে ‘সোয়া লাখ’ থেকেই ‘শোলাকিয়া’ নামটি চালু হয়ে যায়। পরে ১৯৫০ সালে স্থানীয় দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ (মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর) ঈদগাহের জন্য ৪ দশমিক ৩৫ একর জমি শোলাকিয়া ঈদগাহে ওয়াকফ করেন। প্রায় সাত একর আয়তনের মাঠটিতে ২৬৫টি কাতার রয়েছে।
ঐতিহাসিক এই জামাতে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সাধারণ মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করেন।
সাজন আহম্মেদ পাপন
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
তারিখ- ২৮-০৫-২৬ ইং
০১৯১২৩৬৭৪৩০