গফরগাঁও প্রতিনিধি
১৯৯৭ সালের ২৯ এপ্রিল গফরগাঁওয়ে বিএনপির জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ উঠেছিল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, ওই সময় গফরগাঁওয়ের ছাত্রলীগের সক্রিয় ক্যাডারদের মধ্যে ছিলেন শাহ মাজহারুল হক কামাল। পরে ২০০০ সালে পুরষ্কার স্বরূপ খাদ্য বিভাগে নিয়োগ পান তিনি। বেগম জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদেই চাকরি পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
চাকরিজীবনের শুরুতে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলায় ২৬/১২/২০০০ ইং সালে যোগদান করে কর্মরত ছিলেন মাজহারুল ইসলাম কামাল। পরে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় বদলি হন। কিন্তু ঈশ্বরগঞ্জে বদলির পর মূল কর্মস্থলে না থেকে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ডেপুটেশনে যোগ দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ময়মনসিংহেই অবস্থান করছেন তিনি।
একজন খাদ্য পরিদর্শকের মূল কর্মস্থল ঈশ্বরগঞ্জ হলেও বছরের পর বছর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে অবস্থানের বিষয়টি নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। কোন আদেশে তাকে ডেপুটেশনে নেওয়া হয়েছিল, সেই আদেশের মেয়াদ কতদিন ছিল এবং পরবর্তী সময়ে কীভাবে তা বহাল ছিল এসব নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
দীর্ঘদিন ময়মনসিংহে থাকার সুবাদে মাজহারুল ইসলাম কামাল খাদ্য বিভাগের বদলি-পদায়ন, পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদবির-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দিতে তদবির করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
খাদ্য পরিদর্শক সমিতির কার্যালয়ে জুয়ার অভিযোগ
মাজহারুল ইসলাম কামালকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠেছে ময়মনসিংহ নতুন বাজার কাঁচাবাজার এলাকার একটি কার্যালয়কে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, গেন্দু মিয়ার হোটেলের পাশে ময়মনসিংহ খাদ্য পরিদর্শক সমিতির একটি কার্যালয়ে রাতে নিয়মিত কোটি কোটি টাকার জুয়ার আসর বসে। সেখানে প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয় এবং সেই অর্থের পুরোটাই মাজহারুল ইসলাম কামালের কাছে যায় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
সম্পদের তালিকায় ফ্ল্যাট-বাড়ি-দোকান
তথ্যদাতাদের দেওয়া তথ্যে মাজহারুল ইসলাম কামালের নামে বেনামে ও স্বজনদের নামে কিংবা তার সংশ্লিষ্টতায় থাকা বলে দাবি করা সম্পদের মধ্যে রয়েছে ময়মনসিংহের মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজার ৭সি নম্বর ফ্ল্যাট, দুর্গাবাড়ী এলাকার একটি ফ্ল্যাট ও দুর্গাবাড়ী রোডের একটি দোকান। ফারহান কমপ্লেক্সে দুটি ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া কাঁচিঝুলিতে দুই ভাইয়ের নামে ছয়তলা ফাউন্ডেশনের চারতলা বাড়ি, গফরগাঁও জামতলা মোড়ে একটি দোকান এবং ইমামবাড়ী ঈদগাহসংলগ্ন বাজারে আরেকটি দোকান থাকার অভিযোগ রয়েছে। ঢাকার উত্তরা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং ঢাকা বাইপাস মোড়ে এসএসসি-৯৩ ব্যাচের বন্ধুদের সম্মিলিতভাবে কেনা জমিতে তার তিনটি শেয়ার থাকার কথাও বলা হচ্ছে।
আরও অভিযোগ, ঢাকা মেট্রো-গ-৪৩-২৬৪৭ নম্বরের একটি গাড়ি ময়মনসিংহ খাদ্য বিভাগের পরিবহন ঠিকাদার ও সাবেক যুবলীগ নেতা আবু বকর সিদ্দিক ওরফে আজাদের নামে নিবন্ধিত হলেও সেটি মাজহারুল ইসলাম কামাল ব্যবহার করেন। ইতালি প্রবাসী এক শালার নামে বিভিন্ন জায়গা ও ব্যবসায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন
মাজহারুল ইসলাম কামাল গফরগাঁও সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। গফরগাঁও সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে সদস্য পদে নির্বাচিত হওয়ার তথ্যও রয়েছে। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক জনৈক এক ব্যত্তি বলেন, ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসে বসে খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল বর্তমান সরকারকে বেকায়দা বা দুর্নাম ছড়াতে দেশে খাদ্য, তৈল,সার, বিদ্যুৎ সংকট ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও মাজহারুল ইসলাম কামাল কীভাবে আগের মতোই ময়মনসিংহে অবস্থান করে প্রশাসনিক সুবিধা ভোগ করে আসছেন। তার দীর্ঘদিনের ডেপুটেশন, কর্মস্থল এবং বিভাগীয় কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। ময়মনসিংহ জেলা দুনীতি দমন কমিশন( দুদক) রঞ্জিত কুমার কর্মকার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে দিনকালকে বলেন, ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য পরিদর্শক মাজহারুল ইসলাম কামাল বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা তথ্য নেই। তিনি আরো বলেন, যে কোনো মিডিয়া বা গণমাধ্যমে যদি সংবাদ প্রকাশ হলে তা আমরা কমিশনের অনুমতি নিয়ে তদন্ত করে ব্যবস্হা নেয়া হবে। ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান তিনি প্রশিক্ষণ থাকায় মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরডি ফুড) হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন আশরাফুল আলম বলেন, খাদ্য পরিদর্শক মাজহারুল ইসলাম কামালের ডেপুটেশনের বৈধতা, বদলি-পদায়ন ও ঠিকাদারি তদবিরের অভিযোগ, কথিত জুয়ার আসর এবং তার সম্পদ অর্জনের বিষয়গুলো তদন্ত করা হবে কি না এবিষয়ে তিনি জানান,
মাজহারুল ইসলাম কামাল তার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ছিলেন এবং তার সময়ে মাজহারুল ইসলাম কামালের ডেপুটেশন-সংক্রান্ত কোনো আদেশ হয়নি। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল হক কামাল বলেন, ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসে এক বছর সাত মাস হলো ডেপুটেশন আছি। নির্দিষ্ট করে যোগদানের তারিখ বলতে পারে নাই। তবে ফাইল দেখে বলতে পারবো।