এসকে শাহীন নবাব :
সৌদি আরবে বজ্রপাতে নিহত কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর পৌরসভার পশ্চিম ধুলজুরী গ্রামের প্রবাসী রাসেল মিয়ার মৃত্যুর পর কেটে গেছে কয়েক মাস। কিন্তু সরকারি সহায়তার আশ্বাসের বেশিরভাগই এখনো বাস্তবে রূপ না পাওয়ায় তার পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।
একসময় যে মানুষটি প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতেন, তার মৃত্যুর পর আজ সেই পরিবারের চুলায় অনেক দিনই আগুন জ্বলে না।
রাসেল মিয়ার স্ত্রী শাহানাজ চার সন্তানকে নিয়ে একটি ভাঙাচোরা ঘরে অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন। পরিবারের কোনো স্থায়ী আয় নেই।
সরেজমিনে জানা যায়,রাসেলের স্ত্রী শাহানাজ নিজেও অসুস্থ। স্বামীর মৃত্যুর শোক সামলাতে না সামলাতেই মাত্র ১৬ দিনের মাথায় মারা যান তার মা। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে তিনি হারিয়েছেন একমাত্র আশ্রয়টুকুও।
রাসেলের বৃদ্ধ মা মোমেনা আক্তার ও স্থানীয়দের ভাষ্য, তিন বেলার খাবারের পরিবর্তে অনেক দিন একবেলা খেয়েই দিন পার করতে হচ্ছে তাদের। সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ তো দূরের কথা, ঠিকমতো খাবার জোগাড় করাও এখন পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ১০ মার্চ ২০২৬ সালে সৌদি আরবে কর্মস্থলে মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে রাসেল মিয়ার মৃত্যু হয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ও চার সন্তান চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
এরপর তিন চারদিন পরে নিহতের বাড়িতে গিয়ে ঈদ উপলক্ষে জামাকাপড়, খাদ্যসামগ্রী ও নগদ কিছু অর্থ বিতরণ করেন উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যাক্তি। তিনি পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে, এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি অনুদানের ব্যবস্থারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, সেই আশ্বাসের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও উল্লেখযোগ্য কোনো সরকারি সহায়তা তারা পাননি। ফলে দিন দিন আরও অসহায় হয়ে পড়ছে পরিবারটি।
প্রতিবেশী আবু রায়হান জানান, রাসেল মিয়ার পরিবার এখন চরম মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং দেশের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি দ্রুত এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু সাময়িক সহায়তা নয়, পরিবারটির জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন, বিধবা ভাতা, শিশুদের শিক্ষা সহায়তা এবং নিয়মিত সরকারি সহযোগিতার ব্যবস্থা করা জরুরি। তাদের প্রশ্ন—একজন প্রবাসী দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে মৃত্যুবরণ করার পর তার অসহায় পরিবার কি এভাবেই অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকবে?
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহানাজ বলেন, “স্বামী চলে গেছে, এরপর মা-ও মারা গেলেন। আমার মা-বাবা, ভাই-বোন কেউ নেই। চারটা সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচব বুঝতে পারছি না। অনেক সময় সন্তানদের ঠিকমতো খাবারও দিতে পারি না।”
সরকারি সহযোগিতার আশায় আছি, কিন্তু এখনো তেমন কোনো সহায়তা পাইনি।
স্থানীয় ৬ নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার মিসবাহ উদ্দিন মানিক বলেন, “রাসেল মিয়ার পরিবার আজ চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষ ও মানবিক সংগঠনগুলোকেও দ্রুত এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানো উচিত। চারটি নিষ্পাপ শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
একজন প্রবাসীর মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়—এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতেরও মৃত্যু। রাসেল মিয়ার চার সন্তান আজও অপেক্ষায় আছে, তাদের বাবার দেওয়া সেই স্বপ্নগুলো অন্তত রাষ্ট্র ও সমাজের সহযোগিতায় যেন বেঁচে থাকে।