রেহানা ফেরদৌসী
আজ সবাই বাবার ছবি পোস্ট করছে। কিন্তু কিছু সন্তান আছে, যাদের কাছে বাবার একমাত্র ঠিকানা—স্মৃতি। বিশ্ব বাবা দিবসে সেই সব নীরব হৃদয়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
আজ বিশ্ব বাবা দিবস। সকাল থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে উঠেছে বাবাকে নিয়ে ভালোবাসার গল্পে। কোথাও বাবার কাঁধে মাথা রেখে তোলা ছবি,কোথাও বাবার হাত ধরে হাঁটার স্মৃতিচারণ, কোথাও আবার কৃতজ্ঞতার আবেগঘন শব্দমালা। পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরতার মানুষটির প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের দিন আজ।
কিন্তু এই উৎসবের মাঝেও কিছু ঘর আজ অদ্ভুত নীরব।কিছু সন্তানের কাছে বাবা দিবস মানে কোনো ছবি পোস্ট করা নয়, কোনো উপহার দেওয়া নয়, কোনো শুভেচ্ছা জানানো নয়। তাদের কাছে বাবা দিবস মানে একটি দীর্ঘশ্বাস, একটি শূন্যতা, একটি নামহীন অপেক্ষা।হয়তো কোনো ছোট্ট শিশু আজও বুঝে উঠতে পারেনি কেন অন্য বন্ধুরা “বাবা” বলে ডাকলে সাড়া পায়, অথচ তার ডাকে কেউ ফিরে তাকায় না। হয়তো কোনো কিশোর আজও স্কুল থেকে ফেরার পথে খুঁজে বেড়ায় সেই মানুষটিকে, যিনি একদিন তার ছোট্ট হাত ধরে রাস্তা পার করিয়ে দিতেন। হয়তো কোনো তরুণ জীবনের বড় অর্জনের মুহূর্তে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু মনে মনে বলে, “বাবা, তুমি যদি আজ পাশে থাকতে!”
বাবা হারানোর কষ্ট আসলে কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এটি এমন এক শূন্যতা, যা ভিড়ের মাঝেও নিঃসঙ্গ করে দেয়। এমন এক অভাব, যা সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না; বরং জীবনের প্রতিটি বাঁকে নতুন করে অনুভূত হয়।
যাদের বাবা আছেন, তাদের কাছে বাবা মানে নিরাপত্তা, সাহস, ছায়া। আর যাদের বাবা নেই, তাদের কাছে বাবা মানে একটি স্মৃতি, একটি অপূর্ণতা, একটি খালি চেয়ার।
সেই চেয়ারটি হয়তো আজও ঘরের কোনো কোণে পড়ে আছে। কেউ সেখানে বসে না। তবুও পরিবারের মানুষজন সেটির দিকে তাকালে একজন মানুষের উপস্থিতি অনুভব করে। কারণ কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের ভালোবাসা ঘর ছেড়ে যায় না।
আজ যখন পৃথিবী বাবা দিবস উদযাপন করছে, তখন হয়তো কোনো এতিম শিশু নীরবে জানালার পাশে বসে আছে। সে জানে না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী লিখতে হয়। জানে না কীভাবে বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে হয়। সে শুধু জানে, তারও একজন বাবা ছিলেন—যিনি তাকে ভালোবাসতেন, আদর করতেন, স্বপ্ন দেখাতেন।
এই মানুষগুলো করুণা চায় না। তারা চায় একটু ভালোবাসা, একটু সহমর্মিতা, একটু আশ্রয়। তারা চায় কেউ একজন তাদের মাথায় হাত রেখে বলুক, “ভয় পেয়ো না, আমি আছি।”
বিশ্ব বাবা দিবসে তাই শুধু নিজের বাবাকে স্মরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আমাদের চারপাশে যেসব এতিমরা বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত, তাদের প্রতিও ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেওয়া আমাদের মানবিক দায়িত্ব। হয়তো একটি স্নেহমাখা কথা, একটি খোঁজ নেওয়া, একটি আন্তরিক স্পর্শ—কোনো একটি এতিমের হৃদয়ের গভীর ক্ষতকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করতে পারে।
আজ যারা বাবাকে জড়িয়ে ধরতে পারছেন, নিঃসন্দেহে তারা সৌভাগ্যবান। আর যারা পারছেন না, তাদের জন্য রইল আন্তরিক দোয়া।
মহান আল্লাহ পৃথিবীর সব জীবিত বাবাকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখুন। আর যেসব সন্তান বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত, তাদের হৃদয়ের শূন্যতা তিনি তার অসীম রহমত দিয়ে পূর্ণ করে দিন।
কারণ বাবা দিবসের সবচেয়ে গভীর গল্পগুলো লেখা থাকে তাদের চোখে, যারা আজও আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটি শব্দ উচ্চারণ করে—
“বাবা…”