ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মহিমান্বিত শিক্ষা ও আত্মত্যাগের অনুপম দৃষ্টান্ত। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অসীম ত্যাগ, ধৈর্য ও আনুগত্যের স্মরণে উদযাপিত এই উৎসব কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধের এক গভীর বার্তা বহন করে।
আজকের পৃথিবী যখন বিভাজন, সংঘাত, হিংসা ও অসহিষ্ণুতার নানা সংকটে বিপর্যস্ত, তখন ঈদুল আজহার প্রকৃত শিক্ষা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য পশু জবাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ, হিংসা ও স্বার্থপরতাকে বিসর্জন দেওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এর আসল সৌন্দর্য। মানুষে মানুষে সহমর্মিতা, ভালোবাসা এবং ত্যাগের যে চেতনা ঈদুল আজহা আমাদের সামনে তুলে ধরে, সেটিই হতে পারে একটি মানবিক সমাজ বিনির্মাণের মূল শক্তি।
বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এদেশে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একে অপরের আনন্দ-উৎসবে অংশগ্রহণ করে। ঈদুল আজহার আনন্দও তাই কেবল মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পরিণত হয় সার্বজনীন মানবিক উৎসবে। সমাজের ধনী-গরিব, সুবিধাভোগী ও বঞ্চিত মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সমতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এই উৎসবের অন্যতম শিক্ষা।
বর্তমান সময়ে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও ঈদের এই শিক্ষার প্রতিফলন অত্যন্ত জরুরি। প্রতিহিংসা, বিভক্তি ও অস্থিরতার রাজনীতি জাতিকে কখনোই সামনে এগিয়ে নিতে পারে না। জাতীয় অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা। ঈদুল আজহার শিক্ষা আমাদের সেই পথেই আহ্বান জানায়—যেখানে থাকবে ত্যাগ, মানবতা ও কল্যাণের রাজনীতি।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের উচিত সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কোরবানির মাংস বণ্টনের মধ্য দিয়ে সমাজে যে সমতা ও সহমর্মিতার চর্চা হয়, তা যদি সারা বছর ধরে অব্যাহত থাকে, তবে বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। কারণ প্রকৃত ধর্ম কখনো বৈষম্য শেখায় না; বরং মানুষের কল্যাণ ও মানবতার সেবাকেই সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়।
ঈদ আমাদের শিখিয়ে দেয়—ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে সামষ্টিক কল্যাণ অনেক বড়। তাই আসুন, এই পবিত্র ঈদুল আজহায় আমরা হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিজেদের নিবেদিত করি। পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা এবং মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশবাসীসহ বিশ্বের সকল মুসলিম উম্মাহর প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ। মহান আল্লাহ আমাদের সবার কোরবানি কবুল করুন এবং দেশ, জাতি ও বিশ্ব মানবতার জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ বয়ে আনুন।
— রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
২৭ মে ২০২৬ ইং