1. admin2@kalernatunsangbad.com : admin : Admin
  2. admin@kalernatunsangbad.com : Khairul Islam :
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ০৫:০৬ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
শিরোনাম

প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতি: দেশ ও মানুষের কল্যাণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

  • প্রকাশ কাল সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
  • ১৪ বার পড়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন বহু মুহূর্ত এসেছে যখন রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের অঙ্গীকার—এই তিনটি বিষয় যখন এক বিন্দুতে মিলিত হয়, তখনই জাতীয় উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। শনিবার (১৩ জুন) কক্সবাজারে পাতালী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সেই আলোচনাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর বক্তব্যে কৃষক, নারী, শিক্ষা, পরিবেশ এবং জনকল্যাণভিত্তিক উন্নয়নের যে দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।
বাংলাদেশ মূলত একটি কৃষিনির্ভর দেশ। শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পরও দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তির একটি বড় অংশ আজও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গ্রামবাংলার কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদন করেন না; তিনি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারের অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও তারা দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণ করে চলেছেন।
এই বাস্তবতায় কৃষকদের জন্য আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে বীজ ও কীটনাশক ক্রয়ের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তার যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কৃষিকে শুধু উৎপাদনের খাত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখা হয়। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকতে পারে না।
তবে শুধু আর্থিক সহায়তা দিলেই কৃষকের সব সমস্যার সমাধান হবে না। কৃষি খাতে গবেষণা, উন্নত বীজের সহজলভ্যতা, সেচব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। কৃষক যেন উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পান, সেই নিশ্চয়তা দিতে না পারলে আর্থিক প্রণোদনার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। ফলে কৃষিনীতিকে আরও সমন্বিত ও বাস্তবমুখী করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো খাল পুনঃখনন কর্মসূচি। বাংলাদেশের জলভূমি, নদী এবং খাল একসময় এই ভূখণ্ডের প্রাণ ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর অবহেলা, দখল এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে অসংখ্য খাল হারিয়ে গেছে। এর ফল হিসেবে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা, কৃষিতে সেচ সংকট এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা।
খাল পুনঃখননকে অনেকেই শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে এটি পরিবেশ রক্ষা, কৃষি উন্নয়ন এবং জলবায়ু অভিযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি সচল খাল কেবল পানি প্রবাহের পথ নয়; এটি কৃষকের জীবন, জেলের জীবিকা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই খাল পুনঃখননের মতো উদ্যোগকে রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে এনে একটি জাতীয় পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। বাংলাদেশ সেই ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং নদীভাঙন দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে খাল, নদী ও জলাধার পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।
নারী শিক্ষার প্রসঙ্গও বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক অর্জনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নারীর ক্ষমতায়ন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
যে সমাজে নারীরা শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী, সেই সমাজ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বেশি শক্তিশালী হয়। স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা সহজলভ্য করার উদ্যোগ এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শিক্ষা শুধু বিনামূল্যে করলেই হবে না; শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে।উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, যাতে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেন।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তরুণ সমাজের প্রত্যাশাও বিবেচনায় নিতে হবে। আজকের তরুণরা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান শুনে সন্তুষ্ট হয় না। তারা কর্মসংস্থান চায়, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ চায়, স্বচ্ছ প্রশাসন চায় এবং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চায় যেখানে যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মূল্যায়ন হবে। ফলে উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তার বাস্তব প্রতিফলন তরুণদের জীবনে ঘটাতে হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—রাজনীতি কাদের জন্য? যদি রাজনীতি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য হয়, তাহলে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে সাধারণ মানুষকে। কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নারী, প্রবীণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নই হতে হবে রাজনৈতিক সাফল্যের প্রধান সূচক।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় উন্নয়নের চেয়ে দ্বন্দ্ব ও বিভাজন বেশি আলোচিত হয়। অথচ গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় নয়, ইতিবাচক প্রতিযোগিতায়। কোন দল বেশি উন্নয়ন করতে পারছে, কে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে, কে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বেশি বিনিয়োগ করছে—সেই প্রতিযোগিতাই একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
আজকের বিশ্বে নেতৃত্বের মূল্যায়ন হয় মানুষের জীবনমান দিয়ে। একটি সরকার কতটি সেতু নির্মাণ করেছে বা কতটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছেছে কি না। একজন কৃষকের আয় বেড়েছে কি না, একজন শিক্ষার্থী মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে কি না, একজন মা নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই প্রকৃত উন্নয়নের মানদণ্ড নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। জনসংখ্যাগত সুবিধা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। আবার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু ঝুঁকি এবং সামাজিক বৈষম্য নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও দায়িত্বশীল, দূরদর্শী এবং জনমুখী হতে হবে।
কক্সবাজারের খাল পুনঃখনন কর্মসূচি কিংবা কৃষক ও নারী উন্নয়নবিষয়ক ঘোষণাগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। জনগণ এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে ফলাফল দেখতে চায়। তারা উন্নয়নের ভাষণ নয়, উন্নয়নের বাস্তব চিত্র দেখতে চায়।
একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা বিশ্বাস করে যে সরকার তাদের পাশে আছে। সেই বিশ্বাস অর্জন করা যায় না শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে; অর্জন করতে হয় কর্মের মাধ্যমে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব নেতৃত্ব মানুষের জীবনমান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, জনগণ শেষ পর্যন্ত তাদেরই স্মরণ রেখেছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে সেই জনমুখী রাজনীতির ওপর—যে রাজনীতির কেন্দ্রে থাকবে মানুষ, উন্নয়ন এবং জাতীয় স্বার্থ। কারণ ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের কল্যাণই ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে থাকে।

— রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
☞বিশিষ্ট লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

১৫:০৬:২০২৬ ইং

শেয়ার করুন

অন্যান্য সংবাদসমূহ


প্রযুক্তি সহায়তায় BTMAXHOST