বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র আজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে এমন সব চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়েছে, যা কয়েক দশক আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। প্রচলিত যুদ্ধ, সীমান্ত সংঘাত কিংবা রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের লড়াইয়ের পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে সাইবার হামলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যযুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নিরাপত্তা সংকট, আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদ, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং অভিবাসনজনিত মানবিক বিপর্যয়। ফলে বিশ্বশান্তি রক্ষার ধারণাও পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম আর কেবল অস্ত্রধারী বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, মানবিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ।
এই প্রেক্ষাপটে বুধবার (১০ জুন) আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বক্তব্য প্রদান করেছেন, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ভবিষ্যতের শান্তিরক্ষা মিশনগুলোকে হতে হবে আরও আধুনিক, আরও দূরদর্শী এবং প্রযুক্তিনির্ভর। বাস্তবতা হলো, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি বাংলাদেশকেও সেই পথেই এগিয়ে যেতে বাধ্য করছে।
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা ইতিহাস আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য সাফল্যের নাম। ১৯৮৮ সালে প্রথম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং সম্মানজনক অবদানে পরিণত হয়েছে। গত প্রায় চার দশকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর দুই লক্ষাধিক সদস্য বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেছেন। আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপ—বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পদচারণায় উজ্জ্বল হয়েছে বহু যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ।
এই অর্জনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য ত্যাগ, সাহসিকতা এবং আত্মনিবেদন। জাতিসংঘের নীল হেলমেট পরে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১৭৫ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের এই আত্মত্যাগ কেবল বাংলাদেশের জন্য গর্বের নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। কারণ তারা নিজেদের মাতৃভূমির বাইরে গিয়ে এমন মানুষদের জন্য জীবন দিয়েছেন, যাদের সঙ্গে তাদের কোনো ভাষাগত, জাতিগত বা ভৌগোলিক সম্পর্ক ছিল না। মানবতার প্রতি এমন দায়বদ্ধতা পৃথিবীর ইতিহাসে সবসময়ই সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের পেশাদারিত্ব, মানবিকতা এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক স্থাপনের সক্ষমতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশি সেনা ও পুলিশ সদস্যরা শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করেননি; তারা স্কুল নির্মাণ করেছেন, চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন, নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় কাজ করেছেন এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন। এই কারণেই জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের বিশেষভাবে প্রশংসা করা হয়েছে।
তবে বর্তমান বিশ্বে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের চরিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। একসময় সংঘাত মানেই ছিল অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান। কিন্তু আজকের সংঘাতের বড় অংশ ঘটে ডিজিটাল পরিসরে। ভুয়া তথ্য, অপপ্রচার, সাইবার আক্রমণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাশকতা অনেক সময় প্রচলিত যুদ্ধের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী যে প্রযুক্তিনির্ভর শান্তিরক্ষা বাহিনী গঠনের কথা বলেছেন, তা কেবল একটি নীতিগত ঘোষণা নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ রূপরেখা।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি, সাইবার গোয়েন্দা ব্যবস্থা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিরাপত্তা অবকাঠামোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও এসব প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি আগামী দিনেও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থান ধরে রাখতে চায়, তবে তাকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পেশাদারিত্ব, ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ডের ওপর জোর দেওয়া। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়, একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের পেশাদার চরিত্রের ওপর। সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্রের আধিক্যে নয়; বরং তাদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতায় নিহিত।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা আমাদের শিক্ষা দেয়—যখনই জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিভাজন বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, তখনই রাষ্ট্রকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে। অতীতের বিভিন্ন সংকটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা কেবল সশস্ত্র বাহিনীর জন্য নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। কারণ শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দিয়ে।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় উত্তরাধিকার বহন করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাদের অবদান জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। সেই ঐতিহ্য রক্ষা করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া শুধু বাহিনীর দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র জাতির দায়িত্ব। জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসন এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি পেশাদার ও আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর বিকল্প নেই।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে নারী শান্তিরক্ষীদের অবদানের কথাও উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ১১ শতাংশ নারী সদস্য বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কারণ সংঘাত-পরবর্তী সমাজে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নারী শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা অত্যন্ত কার্যকর। বাংলাদেশের নারী সদস্যরা ইতোমধ্যে বহু মিশনে নেতৃত্বগুণ, দক্ষতা এবং সাহসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শুধু একটি সামরিক দায়িত্ব নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পদও। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনে শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা অপরিসীম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ যখন বাংলাদেশের নাম শোনে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তাদের প্রথম পরিচয় আসে শান্তিরক্ষীদের মাধ্যমে। ফলে প্রতিটি শান্তিরক্ষী কার্যত বাংলাদেশের একজন অনানুষ্ঠানিক রাষ্ট্রদূত।
বাংলাদেশের সংবিধানে বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার রয়েছে, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম তারই বাস্তব প্রতিফলন। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সবসময় বহুপাক্ষিক কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছে। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও এই নীতিগত অবস্থান আমাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
আজকের পৃথিবী ক্রমশ মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের মধ্যে অনেক রাষ্ট্রই নিজেদের অবস্থান নির্ধারণে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি শান্তি, সংলাপ এবং সহযোগিতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখতে পারে, তবে তা শুধু কূটনৈতিকভাবেই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে।
সুতরাং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বার্তা দিয়েছেন, তার তাৎপর্য কেবল একটি দিবস উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নিরাপত্তা দর্শন, আন্তর্জাতিক ভূমিকা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি রূপরেখা। আধুনিক প্রযুক্তি, পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, জাতীয় ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধ—এই পাঁচ স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই আগামী দিনের বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বশান্তির পথে বাংলাদেশের যাত্রা ইতোমধ্যেই সম্মানের। এখন প্রয়োজন সেই যাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ, আরও আধুনিক এবং আরও কার্যকর করে তোলা। আমাদের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে সুনাম অর্জন করেছেন, তা শুধু ধরে রাখাই নয়; বরং নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই হোক রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।
বাংলাদেশের পতাকা যখন জাতিসংঘের নীল পতাকার পাশে উড়ে, তখন সেটি শুধু একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে না; এটি শান্তি, মানবতা এবং দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে ওঠে। সেই গৌরব অটুট থাকুক, আরও প্রসারিত হোক—এটাই আজকের প্রত্যাশা।লেখক–রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান (বিশিষ্ট কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক) ১০:০৬:২০২৬ ইং