রেহানা ফেরদৌসী
জিলহজের নবম দিন। সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ আরাফার ময়দান তখন সাদা ইহরামে মোড়ানো লাখো মানুষের উপস্থিতিতে এক অনন্য দৃশ্য। কেউ দোয়ায় মগ্ন, কেউ অশ্রুসিক্ত চোখে ক্ষমা প্রার্থনা করছে, কেউ আবার নীরবে তাকিয়ে আছে সেই মিম্বরের দিকে—যেখান থেকে উচ্চারিত হবে হজ্জের পবিত্র খুতবা। মুসলিম বিশ্বের কাছে এই মুহূর্ত শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং ঈমান, আত্মশুদ্ধি ও মানবিক ঐক্যের এক গভীর আহ্বান। আর সেই মিম্বরে দাঁড়ানো মানুষটি তাই স্বাভাবিকভাবেই কোটি মুসলমানের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে ওঠেন।
এই আলোচনার কেন্দ্রেই রয়েছেন মদিনার মসজিদে নবীর সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি—যার কণ্ঠ বহু বছর ধরে মুসলিম হৃদয়ে কুরআনের সুর হয়ে বেজে চলেছে।
১৯৪৭ সালের ২ মে সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলের আল-কারন আল-মুস্তাকিম এলাকায় জন্ম নেওয়া শায়খ আল-হুজাইফির শৈশব কেটেছে ধর্মীয় আবহে। তার পিতা ছিলেন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও খতিব। ফলে ঘরের পরিবেশেই ছোট্ট আলীর সামনে খুলে যায় কুরআন ও দ্বীনি শিক্ষার জগৎ। গ্রামের মক্তবে বসেই তিনি কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, এই শিশুর কণ্ঠ একদিন পৃথিবীর কোটি মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠবে।
কৈশোর থেকেই তার জ্ঞানপিপাসা ছিল গভীর। সাধারণ ধর্মীয় শিক্ষায় থেমে না থেকে তিনি ইসলামি জ্ঞানের উচ্চতর পথে এগিয়ে যান। প্রথমে সালাফিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরে সায়েন্টিফিক ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা শেষে ১৯৭২ সালে রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শরিয়াহ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। জ্ঞানসন্ধান তাকে পরে নিয়ে যায় মিশরের ঐতিহাসিক আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে ইসলামি আইন ও ফিকহে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে তিনি স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
তবে শায়খ আল-হুজাইফির পরিচয় কেবল একজন উচ্চশিক্ষিত আলেমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কুরআনের কিরাআতে তার বিশেষ দক্ষতা তাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। প্রখ্যাত ক্বারিদের কাছ থেকে তিনি ইজাজা লাভ করেছেন, হাদিস অধ্যয়নেও অর্জন করেছেন বিশেষ সনদ। ফলে তার ব্যক্তিত্বে একসঙ্গে মিলেছে গবেষক, ফকিহ ও ক্বারির বৈশিষ্ট্য।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি শিক্ষকতার পথ বেছে নেন। তাফসির, তাওহিদ, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ ও কিরাআতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়িয়েছেন বিভিন্ন ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। মদিনার ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র ও কুরআন কলেজে তার দীর্ঘ শিক্ষকতা অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনকে প্রভাবিত করেছে। ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু শিক্ষক নন, বরং সহজ ভাষায় জটিল বিষয় বোঝাতে পারদর্শী এক পথপ্রদর্শক।
এরপর আসে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৯ সালে তিনি মসজিদে নবীর ইমাম ও খতিব হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন—যা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক ধর্মীয় দায়িত্ব। মদিনার সেই পবিত্র মসজিদে দাঁড়িয়ে তার পরিচালিত নামাজ ও খুতবা ধীরে ধীরে তাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তোলে। ১৯৮১ সালের রমজানে তিনি মসজিদুল হারামে তারাবির নামাজে ইমামতি করেন; কিছু সময় দায়িত্ব পালন করেন মসজিদে কুবার ইমাম ও খতিব হিসেবেও।
আজও তার তিলাওয়াতের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়। ধীর, ভারসাম্যপূর্ণ ও আবেগময় সেই কণ্ঠ বহু মানুষের কাছে প্রশান্তির নাম। কুরআনের আয়াত যখন তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, তখন তা শুধু পাঠ নয়—বরং এক আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে রূপ নেয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে অসংখ্য মুসলমান তার তিলাওয়াত শুনে কুরআনের প্রতি নতুন অনুরাগ অনুভব করেন।
খ্যাতি ও মর্যাদার উচ্চতায় পৌঁছেও শায়খ আল-হুজাইফির ব্যক্তিজীবন রয়ে গেছে সরল ও সংযমী। তার বক্তব্যে রাজনৈতিক উত্তেজনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তাওহিদ, তাকওয়া, নৈতিকতা ও মুসলিম ঐক্যের আহ্বান। মসজিদে নবীতে তার হাদিস ও ফিকহের পাঠ বহু বছর ধরে জ্ঞানপিপাসুদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে আছে।
আরাফার মিম্বরের গুরুত্ব এখানেই—এটি শুধু একটি মঞ্চ নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের সঙ্গে সংযোগের এক প্রতীক। সেখানে দাঁড়িয়ে যে আলেম কথা বলেন, তার কণ্ঠ পৌঁছে যায় সীমানা পেরিয়ে কোটি মানুষের ঘরে। শায়খ আলী আল-হুজাইফির দীর্ঘ ইমামতি, গভীর জ্ঞান ও হৃদয়স্পর্শী তিলাওয়াত তাকে সেই মর্যাদার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত করেছে।
শায়খ আলী আল-হুজাইফিকে জানা তাই কেবল একজন খতিবকে জানা নয়। তাকে জানা মানে কুরআনের সেবা, জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের এক দীর্ঘ যাত্রাকে জানা। মদিনার মিম্বর থেকে আরাফার প্রান্তর—তার কণ্ঠ আজও মুসলিম হৃদয়ে প্রশান্তি, ঈমান ও কুরআনের প্রতি ভালোবাসার বার্তা বহন করে চলেছে।