শিবলী সাদিক খানঃ
“জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ময়মনসিংহে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। এ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) সকালে পরিবেশ অধিদপ্তর, ময়মনসিংহ বিভাগের আয়োজনে এবং বিভাগীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার। সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার বলেন, পরিবেশ রক্ষায় প্রত্যেককে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
বিষয়টি শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, আমরা নিজেদের শিক্ষিত ও সভ্য মনে করি, কিন্তু নাগরিক আচরণের ক্ষেত্রে এখনও অনেক পিছিয়ে আছি। আচরণগত পরিবর্তন না এলে শুধু সভা-সেমিনার কিংবা সচেতনতামূলক কর্মসূচি দিয়ে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতার জন্য কেবল প্রশাসনকে দায়ী করলে চলবে না। আমাদের অসচেতন কর্মকাণ্ড ও এর জন্য সমানভাবে দায়ী। ফুটপাত দখল, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা, ড্রেনে বর্জ্য নিক্ষেপ এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনে অনীহা শহরের পরিবেশ ও জলাবদ্ধতা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। এসব অভ্যাস পরিবর্তন না হলে টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। তবে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। উন্নয়ন ও পরিবেশ এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই টেকসই অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব তুলে ধরে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, বন্যা, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাই পরিবেশ রক্ষায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। তিনি জানান, সরকার সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এই কর্মসূচি সফল করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ সবাইকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে।
সবশেষে তিনি বলেন, একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রশাসনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে পারলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। তিনি পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, নিয়মিত বৃক্ষরোপণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ)-এর মহাপরিচালক ফরিদ আহ্মদ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুরাদ আহমেদ ফারুখ। তারা পরিবেশ সংরক্ষণে গবেষণা, শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনা সভা শেষে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত বিতর্ক ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পরে পরিবেশ সংরক্ষণে অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গণমাধ্যমকর্মী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।