লেখাঃরেহানা ফেরদৌসী
বৈশাখী পূর্ণিমার চাঁদটা আজ একটু বেশি উজ্জ্বল। কারণ এই চাঁদের নিচেই একদিন জন্মেছিলেন একজন রাজপুত্র, যিনি রাজ্য ছেড়ে পথে নেমেছিলেন মানুষের দুঃখ খুঁজতে। আবার এই চাঁদের নিচেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন দুঃখ মুক্তির পথ। সেই পথের নাম বুদ্ধ। আর সেই চাঁদের নাম বৌদ্ধ পূর্ণিমা। বৌদ্ধ পূর্ণিমা কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এটি ‘ত্রিস্মৃতি বিজড়িত’ তিথি। অর্থাৎ বৈশাখী পূর্ণিমার এই একই দিনে গৌতম বুদ্ধের জীবনের তিনটি মহাঘটনা ঘটেছিল।
খ্রিষ্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে, নেপালের লুম্বিনি কাননে রাজা শুদ্ধোধন ও রানি মায়াদেবীর ঘরে সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্ম। ৩৫ বছর বয়সে, ভারতের বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষমূলে দীর্ঘ ছয় বছরের কঠোর সাধনার পর তিনি ‘বুদ্ধ’ অর্থাৎ জাগ্রত পুরুষে পরিণত হন।৮০ বছর বয়সে, কুশীনগরে তিনি দেহত্যাগ করেন।এই তিন ঘটনার একই তিথিতে সংঘটিত হওয়ার কারণে বৈশাখী পূর্ণিমা বৌদ্ধদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র দিন। জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালে এই দিনটিকে ‘Vesak Day’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশে এটি সরকারি ছুটির দিন।
বৌদ্ধ ধর্মে পূর্ণিমা শুধু একটি ক্যালেন্ডারভিত্তিক দিন নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, নৈতিক উন্নতি ও করুণা চর্চার একটি প্রতীকী সময়। এই দিনে অনুসারীরা সাধারণত পাঁচটি শীল (নৈতিক বিধান) পালন, ধ্যান, উপোস এবং দান-ধ্যানের মাধ্যমে আত্মিক অনুশীলনে অংশ নেন।
বৌদ্ধ পূর্ণিমার আচারগুলো শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রতিটির দার্শনিক ভিত্তি আছে।সূর্যোদয়ের আগে বিহারে সমবেত হয়ে ত্রিশরণ মন্ত্রে বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের শরণ নেওয়া হয়। গৃহীরা পঞ্চশীল এবং উপাসক-উপাসিকারা অষ্টশীল গ্রহণ করেন। এর মূল কথা হলো সংযম।বুদ্ধমূর্তিকে চন্দনজল ও সুগন্ধি দিয়ে স্নান করানো হয়। এর তাৎপর্য হলো নিজের মনের কালিমা ধুয়ে ফেলা। ফুল, প্রদীপ, ধূপ দিয়ে পূজা করা হয়। বুদ্ধ নিজে বলেছেন, ফুলের মতো জীবনও ক্ষণস্থায়ী। প্রদীপ হলো প্রজ্ঞার প্রতীক।বুদ্ধ বলেছেন, ‘সংঘদানং মহাপ্ফলং’। অর্থাৎ সংঘকে দান মহাফলদায়ী। এই দিনে ভিক্ষুদের উৎকৃষ্ট খাবার, চীবর ও ওষুধ দান করা হয়।’জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’ এই মৈত্রীবাণী নিয়ে শোভাযাত্রা বের হয়। সন্ধ্যায় ফানুস ওড়ানো হয়। ফানুস আকাশে উড়িয়ে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে প্রজ্ঞার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতীক।অনেক বিহারে রক্তদান, বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প, অনাথদের খাওয়ানো ও বস্ত্রদান করা হয়। কারণ বুদ্ধের ধর্মের মূল কথা ‘বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়’। এই দিনে অনেক বৌদ্ধ আমিষ ছাড়েন, পঞ্চশীল গ্রহণ করেন — প্রাণী হত্যা না করা, চুরি না করা, মিথ্যা না বলা, ব্যভিচার না করা, নেশা না করা। পাখি অবমুক্ত করা, খাঁচার প্রাণী ছেড়ে দেওয়া হয়। কারণ বুদ্ধ বলেছেন, “সব্বে সত্তা সুখী হোন্তু” — জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। বুদ্ধ পূর্ণিমা শুধু উৎসব নয়, আত্মসমালোচনার দিন।মানুষ কি সত্যিই বুদ্ধের পঞ্চশীল মানছে?প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকছে?মিথ্যা, চুরি, ব্যভিচার, নেশা থেকে দূরে আছে?বুদ্ধের সবচেয়ে আধুনিক শিক্ষা হলো মধ্যপন্থা। চরম ভোগও না, চরম কৃচ্ছ্রও না। আজকের ভোগবাদী সমাজে, যুদ্ধ আর হানাহানির যুগে বুদ্ধের এই ‘মধ্যম পথ’ই আমাদের বাঁচাতে পারে। বৌদ্ধ পূর্ণিমা সেই কথাটাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। বুদ্ধ পূর্ণিমার আচারগুলো দেখলে বোঝা যায়, এই ধর্ম কতটা প্রতীকী আর কতটা মানবিক।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন, বুদ্ধ কোনো দেবতা নন, বরং তিনি একজন জাগ্রত মানব—যিনি নিজের সাধনা ও উপলব্ধির মাধ্যমে সত্যকে অনুধাবন করেছেন। তাই তাঁর শিক্ষা অনুসরণ মানে কোনো অন্ধ বিশ্বাস নয়, বরং সচেতনতা, নৈতিকতা ও মননশীলতার অনুশীলন। অনেকে ভাবে বৌদ্ধ পূর্ণিমা মানে শুধু বিহারে যাওয়া আর ভালো খাওয়া। কিন্তু বুদ্ধ তো কর্মের ধর্ম দিয়েছেন।বুদ্ধ পূর্ণিমা আমাদের মনে করিয়ে দেয় — দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখের শেষও আছে। আর সেই শেষের পথ হলো অষ্টাঙ্গিক মার্গ।
আমরা একটা অস্থির সময়ে বাস করছি। চারপাশে শব্দ, বিদ্বেষ, দৌড়। বুদ্ধ পূর্ণিমা আমাদের থামতে বলে। বলে, একটু বসো বোধিবৃক্ষের নিচে। নিজেকে জিজ্ঞেস করো — আমি কি জেগে আছি, নাকি ঘুমিয়ে হাঁটছি?বুদ্ধ কোনো অলৌকিকতার প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি বলেছেন, “এসো, দেখো, যাচাই করো।” এই বৈজ্ঞানিক স্পর্ধা, এই মানবিক করুণা — এটাই বুদ্ধ পূর্ণিমার আসল আলো।
পূর্ণিমার চাঁদ ডুবে যাবে। কিন্তু আজ রাতে যে প্রদীপটা মনে জ্বালালেন, সেটা যেন নিভে না যায়। কারণ জগতের সবচেয়ে বড় অন্ধকার হলো মনের অন্ধকার। আর বুদ্ধ সেই অন্ধকার তাড়াতেই এসেছিলেন-২৫০০ বছর আগে, এই বৈশাখী পূর্ণিমায়। গৌতম বুদ্ধের দর্শন শুধু বৌদ্ধদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য। হিংসা, বিদ্বেষ ও সংঘাতময় বিশ্বে বুদ্ধের অহিংসা ও মধ্যপন্থা অনুসরণই শান্তির পথ দেখাতে পারে।