শিবলী সাদিক খানঃ
গফরগাঁও-মাওনা সড়ক প্রকল্প ২০২৪ সালের এল এ কেস নং ১০ ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম, জালিয়াতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাত হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির মালিকদের দাবি, তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা দ্রুত প্রক্রিয়া করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দালাল চক্র ভূমি ও স্থাপনার ডকুমেন্ট করে ৮ ধারার নোটিশে সংযুক্ত করে সংঘবদ্ধ দালাল চক্র ভুয়া কাগজপত্র, কৃত্রিম স্থাপনা ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ আদায় করে নিয়েছে এবং নিচ্ছে । এতে প্রকৃত ভূমির মালিক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তেমনি সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের হরিলুট সহ অপচয় হয়েছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধান কালে ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তললি মৌজায় মুরগির খামার দেখিয়ে ভূমির মালিক হাদিউল এবং দালাল ফেরদৌসসহ একটি চক্র প্রায় ৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের চেক উত্তোলন করে নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, খামারটি অধিগ্রহণের আগে সেখানে ছিল না; অধিক ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য রাতারাতি বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল সেই খামার।
একই প্রকল্পের পুরাদিয়ারটেক মৌজায় একটি ডিপ টিউবওয়েলের ক্ষতিপূরণ প্রায় দেড় কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঐ অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা করছেন দালাল ফেরদৌস ও নুরুল আমিনসহ সংশ্লিষ্টরা। একই প্রকল্পের সাদুয়া মৌজায় আরেকটি ডিপ টিউবওয়েলের জন্য প্রায় ৫০ লাখ টাকার নীচে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ দুটির মূল্য নির্ধারণের পরিমাপের ব্যবধান কোটি টাকা এ অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। @
স্থানীয়দের অভিযোগে জানা যায়, ফেরদৌস, জালাল মাস্টার, কামরুল, আক্তারুল আলমসহ কয়েকজন এবং পাঁচ নারী দালাল দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া কাগজপত্র, কৃত্রিম স্থাপনা ও বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে নিজেদের ৮ ধারার নোটিশে অন্তর্ভূক্ত করে বিভিন্ন মৌজায় ক্ষতিপূরণের অর্থ উত্তোলন করেছেন এবং অন্যান্য মৌজার ফাইল আপডেট করে অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে এসকল দালাল সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ সহ হরিলুট করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীদের সমন্বয়ে স্থানীয়দেরএমন অভিযোগ রয়েছে । এছাড়াও অধিগ্রহণের সীমানার বাইরে থাকা অসংখ্য স্থাপনা, পুকুর ও জলাশয়কেও অধিগ্রহণের আওতায় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবী প্রকল্পের মূল নকশা ও অধিগ্রহণের সীমারেখা যাচাই করলে এসব অনিয়ম জালিয়াতির সত্যতা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ অভিযোগ শুধু গফরগাঁও-মাওনা সড়ক প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ নয় বলে দাবি অভিযোগকারীদের। তাদের ভাষ্য মতে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর জেলার বিগত দিনের বিভিন্ন ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্পেও একই সংঘবদ্ধ দালাল চক্র একই কৌশলে সক্রিয় ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ ভূমি ও স্থাপনার মালিক ভূক্তভূগিদের অর্থ প্রাপ্তির নানা বিরম্বনার ভীতি সৃষ্টি করে আগাম কিছু অর্থ লেনদেন করে দালাল চক্র কৌশলে ঐ সকল পরিবারের সদস্যদের ঘনিষ্ঠজন ব্যক্তি হিসাবে ভূমি ও স্থাপনার অংশীদার দেখিয়ে ৮ ধারার নোটিশে দালালদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে চেক গ্রহণের জন্য দ্রুত সময়ে ভুয়া কাগজপত্র ও কৃত্রিম স্থাপনা খাল বিল জলাশয় পুকুর তৈরির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ আদায় করেছে, ফলে সরকারের অর্থের ব্যাপক অপচয় ও হরিলুটের ঘটনা ঘটছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল প্রকল্প গুলোর ভূমি অধিগ্রহণের নথিতে সংযুক্ত ৮ ধারার নোটিশে প্রকৃত ভূমির মালিকদের সাথে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ও চেক বিতরণের তালিকায় দালালদের নামে চেক হস্তান্তর হওয়ায় প্রকৃত মালিক আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অপরদিকে সরকারের ব্যাপক অর্থের অপচয়ের ঘটনাও ঘটেছে। এসকল আর্থিক লেনদেনের ফাইল আপডেট করার কাজে সংশ্লিষ্ট সকল অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্তসহ সরকারের অর্থের সঠিক পরিমাপ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। বিভিন্ন প্রকল্পে সৃজিত স্থাপনা ও সংঘটিত অনিয়ম জালিয়াতি এবং প্রকল্পের অধিক মূল্য ধার্য ও ব্যায় নির্ধারণের সঠিক প্রকৃত চিত্রের নিরপেক্ষ তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এই দালাল চক্র নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে ও নাম ভাঙিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এতে সাধারণ ভূমির মালিকরা ভয়-ভীতির মধ্যে থাকেন এবং অনেকেই অভিযোগ করতে সাহস পান না। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে তারা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে এবং নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।
একাধিক জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় পত্রিকায় এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির মালিকদের দাবি, পুরো ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে ভুয়া স্থাপনা, জাল কাগজপত্র, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও অর্থ বিতরণের সকল নথি যাচাই করা হোক। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আত্মসাৎ ও অপচয় হওয়া সরকারি অর্থ উদ্ধার করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন কতিপয় ভূক্তভোগী। এ প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীদের অনেকেই বদলী সূত্রে বিভিন্ন কর্মস্থলে থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নাই। বর্তমানে ভূমি অধিগ্রহণ অফিসে দালাল থেকে সাবধান সাইনবোর্ড টানালেও বর্ণিত দালালদের এ অফিসে আসা যাওয়া করতে দেখা যায়।
এ সড়ক প্রকল্পের অন্যান্য মৌজার অনিয়ম দুর্নীতির সচিত্র প্রতিবেেদন পরবর্তী সংখ্যায় পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হবে আমাদে