আমজাদ শরীফ:ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার পূর্ব-দক্ষিণ সীমান্তঘেঁষা ঐতিহ্যবাহী সুনামগঞ্জ বাজার আজ এক নিথর নীরবতায় আচ্ছন্ন। বাজারের মধ্যমণি হয়ে যে বিশাল বটবৃক্ষটি গত ২০০ বছর ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, গত রাতের প্রলয়ঙ্করী কালবৈশাখীর তাণ্ডবে তা আজ শেকড়সহ উপড়ে মাটির বুকে লুটিয়ে পড়েছে। একটি মহীরুহের পতন যেন কেবল একটি গাছের মৃত্যু নয়, বরং এলাকাবাসীর কাছে এক জীবন্ত ইতিহাসের চিরবিদায়।
গতকাল গভীর রাতে আচমকা ধেয়ে আসা কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় পুরো বাজার এলাকা। ঝড়ের তীব্রতায় বিশালাকার বটগাছটি উপড়ে পড়লে বাজারের প্রায় ১০ থেকে ১২টি দোকান দুমড়েমুচড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে গভীর রাত হওয়ায় এবং দোকানে কোনো মানুষ না থাকায় বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। ঝড়ের শব্দে যখন গ্রামবাসী ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তাদের প্রিয় আশ্রয়ের এই বিশাল ছায়াটি আর দাঁড়িয়ে ছিল না।
এলাকার মুরুব্বীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই বটগাছটি ছিল এই জনপদের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি শুক্র ও মঙ্গলবার এই গাছের শীতল তলাতেই বসত জমজমাট হাট। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকানগুলোর পসরা সাজানো হতো এই ছায়ার নিচে। জেনারেশনের পর জেনারেশন এই বটতলায় বসে গল্প করেছে, ক্লান্তি দূর করেছে পথিক। আজ সেই আস্থার ঠিকানাটি ধুলোয় মিশে যাওয়ায় বাজারের ব্যবসায়ীদের চোখেমুখে কেবল হাহাকার।
খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সকাল থেকে সুনামগঞ্জ বাজারে ভিড় জমিয়েছেন শত শত মানুষ। আশেপাশের গ্রামগুলো থেকেও মানুষ ছুটে আসছেন তাদের প্রিয় গাছটিকে শেষবারের মতো দেখতে। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখা গেল ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকতে। তিনি বিড়বিড় করে বলছিলেন,
”আমাদের বাপ-দাদারাও এই গাছ দেখে বড় হয়েছেন। আজ মনে হচ্ছে কোনো পুরোনো স্বজনকে হারালাম। এই শূন্যতা আর কোনোদিন পূরণ হবে না।”
কালের পর কাল রোদ-বৃষ্টি সয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই বটবৃক্ষটি আজ আর নেই। বাজারের ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর আর্থিক ক্ষতি হয়তো সময়ের সাথে পুষিয়ে নেওয়া যাবে, কিন্তু দুইশ বছরের পুরনো যে আবেগ আর স্মৃতি এই বটগাছটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, তা চিরতরে হারিয়ে গেল। সুনামগঞ্জ বাজারের আকাশ আজ মেঘমুক্ত হলেও, এলাকাবাসীর মনে রয়ে গেছে এক গভীর বিষণ্ণতার ছায়া।