রুবেল মিয়া, (শেরপুর) থেকে:
‘নলিতা’ শব্দের অর্থ পাট। একসময় এ এলাকায় ব্যাপক পাট উৎপাদন হতো। নালিতাবাড়ী উপজেলা প্রশাসনের সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে ব্যাপক পাট উৎপাদনের কারণে ‘নলিতা’ থেকেই উপজেলার নাম নালিতাবাড়ী হয়েছে। তবে পাটের সঙ্গে নামের এমন ঐতিহাসিক যোগসূত্র থাকলেও বর্তমানে উপজেলায় এ ফসলের চাষ নেমে এসেছে মাত্র ৩ হেক্টর জমিতে। বাজারজাতকরণের দূরত্ব ও উৎপাদন খরচসহ নানা কারণে পাট চাষে আগ্রহ কম থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কোথাও পাট কাটা, কোথাও পানিতে জাগ দেওয়া এবং কোথাও জাগ দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকানোর কাজ করছেন কৃষকরা। তবে কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পুরো উপজেলায় এবার মাত্র ৩ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাট চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ, শ্রমিক, আগাছা দমন, পাট কাটা ও জাগ দেওয়াসহ বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ হয়। ভালো ফলন হলে বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত পাট পাওয়া যায়। প্রতি বিঘায় খরচ হয় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। বাজারদর ভালো থাকলে পাট বিক্রির পাশাপাশি পাটখড়ি বিক্রি করেও বাড়তি আয় করা সম্ভব।
নালিতাবাড়ী উপজেলার কোন্নগর গ্রামের কৃষক আলিম বলেন, “এবার পাটের ফলনের পাশাপাশি আঁশের মানও ভালো হয়েছে। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় সেচ খরচও কমেছে। তবে বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না।”
নালিতাবাড়ীতে পাট চাষ কম থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে বাজারজাতকরণের সমস্যার কথা জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা মো. মানিক মিয়া।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মানিক মিয়া দৈনিক মানবজমিনকে বলেন, “এখান থেকে পাট বিক্রি করতে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। এ কারণে অনেক কৃষক পাট চাষে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। কৃষকদের পাট চাষে আগ্রহী করতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো এ চাষ বাড়ানো সম্ভব হবে।”
নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, “নালিতাবাড়ীতে তেমন পাট চাষ না হলেও উপজেলার নিচু এলাকাগুলোতে পাট চাষের সম্ভাবনা রয়েছে।”
পাটের সঙ্গে নালিতাবাড়ীর সম্পর্ক শুধু নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গেও এ জনপদের রয়েছে পুরোনো যোগসূত্র। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৯৪৩ সালে নালিতাবাড়ীর আড়াইআনী বাজারের নওজোয়ান মাঠে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভার ষষ্ঠ প্রাদেশিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কৃষকদের বিভিন্ন দাবি, খাদ্য সমস্যা, কৃষি উৎপাদন ও কৃষক সংগঠন নিয়ে ওই সম্মেলনে আলোচনা হয়। এর আগে ১৯৩৭ সালেও নালিতাবাড়ীতে কৃষক বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছিল বলে উপজেলা প্রশাসনের সরকারি তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
একসময় যে ফসলের স্থানীয় নাম ‘নলিতা’ থেকে নালিতাবাড়ী নামের উৎপত্তির কথা সরকারি তথ্যে উল্লেখ রয়েছে, সেই পাটের চাষই এখন উপজেলায় মাত্র ৩ হেক্টরে সীমাবদ্ধ। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারজাতকরণের দূরত্ব কমানো ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা গেলে এ ফসলে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব।