লেখাঃরেহানা ফেরদৌসী
একটি মরুভূমি, একটি তাঁবু, কিছু তৃষ্ণার্ত শিশু আর একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ—কারবালার সেই গল্প, যা প্রতিটি শিশু-কিশোরের একবার হলেও জানা উচিত।
পবিত্র মহররম মাসের এক সন্ধ্যায় নানা তার নাতনীকে পাশে বসিয়ে বললেন, “আজ তোমাকে এমন একটি গল্প শোনাব, যা শুধু ইতিহাস নয়, জীবনেরও শিক্ষা।”
নাতনী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “নানা,কিসের গল্প?”
নানা মুচকি হেসে বললেন, “কারবালার গল্প।”
প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে বর্তমান ইরাকের কারবালা নামের একটি মরুভূমিতে ঘটেছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। সেই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র, হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সত্যবাদী, সাহসী, দয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ। সবাই ডাকত “ইমাম হুসাইন”। নানা নামাজ পড়তেন, হুসাইন নানার পিঠে চড়ে বসতেন। নানাও হাসতেন, নামাজ ছাড়তেন না। মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করতেন,ভালোবাসতেন।তিনি কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতেন না এবং সত্যের পথে চলাকে নিজের জীবনের আদর্শ বানিয়েছিলেন।
সময়ের প্রবাহে মুসলিম সমাজে নানা রাজনৈতিক সংকট ও মতবিরোধ দেখা দেয়। তখন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে ইমাম হুসাইন (রা.) মনে করলেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া তার দায়িত্ব। তিনি জানতেন, এ পথ সহজ নয়। তবুও তিনি সত্যের পথ ছেড়ে দেননি।
তিনি তার পরিবার ও কিছু বিশ্বস্ত সঙ্গীকে নিয়ে যাত্রা করেন। কিন্তু কারবালার মরুপ্রান্তরে তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। চারদিকে উত্তপ্ত বালু, মাথার ওপর প্রখর সূর্য, আর সীমিত পানি ও খাদ্য।তাদের সঙ্গে ছিল নারী, শিশু ও পরিবারের সদস্যরা। ছোট ছোট শিশুরাও তৃষ্ণা ও কষ্ট সহ্য করছিল। তবুও তারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।
ঘটনা শুরুর দিকের কথা….মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের কয়েক দশক পরে মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়।হুসাইন বড় হয়ে হলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষদের একজন। গরিবকে খাওয়াতেন, মিথ্যা বলতেন না, কারো মনে কষ্ট দিতেন না। মানুষ তাকে “চাঁদের টুকরা” বলত।তার নানা ইন্তেকালের পর মুসলমানদের দেশের শাসক হলো “ইয়াজিদ”। সে ক্ষমতা পেয়ে ভুলে গেল আল্লাহর ভয়।নেশা করতেন,নামাজ কায়েম করতেন না, গরিবের টাকা লুট করতেন। কেউ কিছু বললে জেলে দেয়া হতো ।ইরাকের “কুফা” শহরের মানুষ কষ্টে চিঠি লিখল হুসাইনকে: “চাচা, আপনি আসুন। আমরা জালিম চাই না, আপনাকে চাই।”হুসাইন জানতেন ইয়াজিদের হাজারো সৈন্য আছে। তার সাথে মাত্র ৭২ জন। তবু তিনি ভাবলেন: “মানুষ কষ্ট পেলে চুপ থাকা যায় না। নানার উম্মতকে বাঁচাতে হবে।”হুসাইন তার বোন জয়নব, ভাই আব্বাস, ৬ মাসের ছেলে আলী আসগর আর ৭০ জন বন্ধু নিয়ে রওনা দিলেন। উট-গাধায় চড়ে, রোদ-ধুলা পেরিয়ে পৌঁছালেন “কারবালা” নামের মরুভূমিতে। ধু ধু বালি, একটা গাছ নেই, এক ফোঁটা পানি নেই।সেখানেই ইয়াজিদের হাজারো সৈন্য পথ আটকাল। বলল: “ইয়াজিদের হাতে বায়াত করো, নাহলে পানি দেব না।”হুসাইন আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন: “আমি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না। সত্যের জন্য কষ্ট সহ্য করতে হয়।”ব্যস, পানি বন্ধ। একদিন… দুই দিন… তিন দিন! ৬ মাসের আলী আসগর তৃষ্ণায় কাঁদে। মা-বোনেরা ঠোঁট ভেজায় বালি দিয়ে। ভাই আব্বাস পানি আনতে গিয়ে দুই হাত কাটিয়ে শহীদ হলেন, কিন্তু ভাইয়ের কাছে পানি পৌঁছাতে পারলেন না।১০ মহরম, আশুরার দিনে সকাল থেকে যুদ্ধ শুরু হলো।একে একে সব সঙ্গী শহীদ হলেন। শেষে রইলেন শুধু হুসাইন আর কোলে ৬ মাসের আলী আসগর। আলী আসগর পানির জন্য ছটফট করছিল। হুসাইন সৈন্যদের বললেন: “ওকে একটু পানি দাও, ও তো কিছু বোঝে না।” তারা তীর ছুড়ল। আলী আসগর বাবার কোলেই…। এরপর হুসাইন একা লড়লেন। সূর্য ডোবার আগে তিনিও শহীদ হলেন। কারবালার বালি লাল হয়ে গেল।যুদ্ধে ইয়াজিদের সৈন্য জিতল, তাঁবু ভাঙল, নারী-বাচ্চা বন্দি হলো। কিন্তু আসল জয় কার হলো? ১৪০ বছর পর আজও পৃথিবীর মানুষ “ইয়াজিদ” নাম ঘৃণা করে, আর “হুসাইন” নাম ভালোবাসে। কারণ তিনি মাথা নত করেননি।
ইমাম হুসাইন (রা.) বিশ্বাস করতেন, মুসলিম সমাজকে সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে। তিনি এমন কোনো অবস্থানের সঙ্গে আপস করতে রাজি হননি, যা তার বিবেক ও আদর্শের পরিপন্থী ছিল।ইতিহাসের পাতায় তাদের আত্মত্যাগ পরাজয়ের গল্প হয়ে থাকেনি; বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।আজও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ কারবালার কথা স্মরণ করে। কারণ কারবালা আমাদের শুধু একটি ঘটনা নয়, একটি শিক্ষা দেয়।কারবালা শেখায়—সত্যের জন্য দাঁড়াতে হয়, যদিও তা কঠিন হয়। অন্যায়কে সমর্থন করা যায় না, যদিও তা শক্তিশালী হয়। ধৈর্য, সততা ও আদর্শের মূল্য কখনো কমে না।
একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষায় নকল না করে নিজের মেধার ওপর ভরসা করে, তখন সে কারবালার শিক্ষা অনুসরণ করে।কোনো শিশু যখন দুর্বল বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়, তখন সে কারবালার শিক্ষা অনুসরণ করে।কেউ যখন মিথ্যা না বলে সত্য কথা বলার সাহস দেখায়, তখনও সে কারবালার শিক্ষা অনুসরণ করে।
তাই কারবালা শুধু অতীতের ইতিহাস নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনের জন্য একটি নৈতিক পাঠশালা।
মহররম ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের একটি। এ মাসে বেশি বেশি ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, তাওবা-ইস্তিগফার এবং সৎকর্ম করা উত্তম।আশুরার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো রোজা রাখা। মহানবী (সা.) আশুরার রোজা রাখতেন এবং উম্মতকে রাখতে উৎসাহিত করেছেন। তাই ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখা উত্তম।
এ ছাড়া—
নানা গল্প শেষ করে নাতনিকে বললেন,
“নানুমণি মনে রেখো—ইমাম হুসাইন (রা.) শুধু ইতিহাসের একজন মহান মানুষ নন; তিনি সত্য, সাহস ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।”
মহররম আমাদের প্রতি বছর মনে করিয়ে দেয়, সত্যের পথ কখনো সহজ নয়। কিন্তু যারা সত্যের জন্য দাঁড়ায়, ইতিহাস তাদের কখনো ভুলে যায় না।
কারবালার মরুভূমি আজও যেন নতুন প্রজন্মকে একটি কথাই বলে—
‘সত্যকে ভালোবাসো, অন্যায়কে না বলো, আর তোমার রবের ওপর ভরসা রাখো।’