বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টায় আত্মনির্ভরশীলতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ
বাংলাদেশ আজ এক নতুন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের এই সময়ে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—কিভাবে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে? কিভাবে একটি রাষ্ট্র জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য একসঙ্গে বজায় রেখে সামনের দিকে এগোবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরশীলতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর সেই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে জাতীয় সংসদ ভবনে নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ অন-গ্রিড রুফটপ প্রকল্পের উদ্বোধন।
রবিবার (২৪ মে) জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে, তা নিছক একটি সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধনী ভাষণ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা। তিনি যথার্থই বলেছেন, “পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, সবুজ অর্থনীতি ও আত্মনির্ভরশীল শক্তি ব্যবস্থার পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।” এই বক্তব্যের মধ্যে কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় দর্শনের প্রতিফলন রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী এখন জ্বালানি রাজনীতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর গোটা পৃথিবী বুঝতে পেরেছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি, গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধি—এসব কেবল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে না, বরং একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করে। এই বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়া কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের জন্য এই প্রয়োজনীয়তা আরও গভীর। কারণ আমরা পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বর্ষণ, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন—এসব এখন আর কেবল গবেষণাগারের আলোচ্য বিষয় নয়; বরং আমাদের প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। কাজেই পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া মানে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন উৎস খোঁজা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
জাতীয় সংসদ ভবনের মতো একটি ঐতিহাসিক ও প্রতীকী স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করার মধ্যেও একটি গভীর বার্তা রয়েছে। লুই আই কানের নকশায় নির্মিত এই ভবন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতীক। সেই ভবনের ছাদে সৌরশক্তির ব্যবহার আসলে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের এক নতুন দর্শনকে সামনে আনে—নেতৃত্ব শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তব কর্মসূচিতেও প্রতিফলিত হতে হবে। সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুপ্রাণিত করবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সৌরশক্তির জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। প্রতিদিন গড়ে প্রতিবর্গ কিলোমিটারে সাড়ে চার থেকে পাঁচ কিলোওয়াট ঘণ্টা সৌরশক্তি পাওয়া যায়—যা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বেশ আশাব্যঞ্জক। আমাদের অসংখ্য শিল্পকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন এবং নগরাঞ্চলের বহুতল স্থাপনার ছাদ আজও ব্যবহৃত হচ্ছে না। অথচ পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে এই ছাদগুলোই হয়ে উঠতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় উৎস।
বিশ্বে সৌরবিদ্যুতের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং উৎপাদন ব্যয় কমে যাওয়ার ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর কেবল পরিবেশবাদীদের স্বপ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও। অনেক দেশ ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশও যদি এখন থেকেই সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ, গবেষণা এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে আগামী এক দশকে জ্বালানি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব।
তবে বাস্তবতা হলো, শুধু প্রকল্প উদ্বোধন করলেই হবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল তৈরি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি। সৌর প্যানেল আমদানিনির্ভর থাকলে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হবে না। এজন্য স্থানীয়ভাবে প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উৎপাদন শিল্প গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তি, স্মার্ট গ্রিড এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জনসচেতনতা। পরিবেশবান্ধব জ্বালানির এই আন্দোলনকে কেবল সরকারের প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রতিটি নাগরিক, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি শিল্প উদ্যোক্তাকে এই অভিযাত্রার অংশ হতে হবে। কারণ টেকসই উন্নয়ন কখনো একক কোনো সরকারের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এটি একটি জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হতে হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে যে আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ডিজিটাল রূপান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বে একটি উদীয়মান উদাহরণ তৈরি করেছে। এখন সময় এসেছে জ্বালানি খাতেও একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের। আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি ব্যবস্থা শুধু অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করবে না; এটি বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকেও আরও সুদৃঢ় করবে।
আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে উন্নয়নের সংজ্ঞা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন উন্নত রাষ্ট্র মানে শুধু উঁচু দালান বা বড় অর্থনীতি নয়; বরং সেই রাষ্ট্র, যে পরিবেশ রক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। বাংলাদেশ যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই যাত্রাকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিতে পারে, তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সবুজ উন্নয়ন মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা অসম্ভব নয়।
অতএব, জাতীয় সংসদ ভবনের এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেবল একটি বিদ্যুৎ উদ্যোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বাংলাদেশের আত্মনির্ভরতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা—যেখানে উন্নয়ন, পরিবেশ এবং জাতীয় স্বার্থ একই সুতোয় গাঁথা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা, একটি সাহসী অঙ্গীকার এবং একটি আলোকিত পথচলার প্রতীক।
—- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
২৪ মে ২০২৬ ইং