কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ)প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, কুলিয়ারচর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মরহুম নূরুল মিল্লাত এঁর স্মরণে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
২৮ জানুয়ারি বুধবার দুপুরে কুলিয়ারচর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও কুলিয়ারচর দলিল লিখক সমিতির যৌথ আয়োজনে সমিতির দপ্তর সম্পাদক মো. জামাল উদ্দিন সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস চত্বরে আয়োজিত দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে কুলিয়ারচর দলিল লিখক সমিতির সদস্য মো. আনোয়ার হোসেন সরকারের সভাপতিত্বে ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নকলনবিশ রুস্তম আলীর সঞ্চালনায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, কুলিয়ারচর দলিল লিখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কনক কান্তি রায় সরকার, সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. ফরিদ মিয়া সরকার, কোষাধ্যক্ষ মো. দেলোয়ার হোসেন শহীদ (মাকছু) সরকার, প্রচার সম্পাদক মো. তৌহিদুল ইসলাম (তৌহিদ) সরকার, কুলিয়ারচর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নকলনবিশ রাহিম আতিব, কুলিয়ারচর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা হুসাইন, মাওলানা নুর উদ্দিন আমিনী ও মাওলানা আব্দুল মমিন সহ কুলিয়ারচর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের স্টাফ ও কুলিয়ারচর দলিল লিখক সমিতির সদস্যবৃন্দ। এছাড়াও স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহন করে।
এসময় সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় বক্তারা নূরুল মিল্লাতের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও এলাকার উন্নয়নে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি কুলিয়ারচরের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন এবং একজন ত্যাগী ও গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে কুলিয়ারচর অনেকটাই অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়েছে।
অনুষ্ঠানের শেষে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয় এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়।
মোনাজাত পরিচালনা করেন উপজেলা আলেম ওলামা দলের সভাপতি ও কুলিয়ারচর উপজেলা বিআরডিবি’র চেয়ারম্যান হাফেজ মো. দ্বীন ইসলাম।
উল্লেখ্য, গত ১৬ জানুয়ারি শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে নূরুল মিল্লাত হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাঁকে চিকিৎসার জন্য ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে ওই দিন সকাল পৌনে ৯টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরে ওইদিন শুক্রবার বাদ আছর পৌর শহরের কুলিয়ারচর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মরহুমের নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর মরদেহ সমাহিত করা হয়।
মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। মৃত্যুকালে স্ত্রী এক ছেলে ও দুই মেয়েসহ অসংখ্য রাজনৈতিক সহকর্মী, আত্মীয় স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
তাঁর মৃত্যুতে কুলিয়ারচর উপজেলা রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। দলীয় নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও সর্বস্তরের মানুষ একজন পরীক্ষিত জনপ্রতিনিধি ও ত্যাগী রাজনৈতিক নেতাকে হারিয়ে শোকাহত। তাঁর মৃত্যুতে কুলিয়ারচর উপজেলা ও পৌর বিএনপি তিন দিনের শোক পালন করেন।
নূরুল মিল্লাত ১৯৫১ সালে কুলিয়ারচর পৌর এলাকার খরকমারা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম মৌলভী আবুল কারাহ মোহাম্মদ নুরুল্লাহ। তিনি ১৯৭৪ সালে ঢাকা কলেজ হতে শিক্ষা জীবন শেষ করেন। ১৯৭৭সালে কুলিয়ারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে তিনি মিশর সফর করেন। ১৯৯২-৯৩ সালে চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের কাছ থেকে স্বর্ণপদক পান। তিনি ১৯৭৭ থেকে ৯৭ সাল পর্যন্ত টানা ৪ বার কুলিয়ারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এরই মধ্যে তিনি ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিভাগের শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি কুলিয়ারচর পৌরসভার দুইবার মেয়র ও একবার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি কুলিয়ারচর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ গত ২০২২ সালের ২ এপ্রিল উপজেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সৎ ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এছাড়াও তিনি কিশোরগঞ্জ মালটি পারপাস সোসাইটির ভাইস চেয়ারম্যান এবং কুলিয়ারচর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কুলিয়ারচর কিণ্ডারগার্টেনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
“নুরুল মিল্লাত ছিলেন একজন সাহসী, সৎ ও ত্যাগী রাজনীতিবিদ। দলের দুঃসময়ে তিনি দৃঢ় অবস্থানে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাই তিনি কুলিয়ারচর ও আশপাশের জনপদের মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ও শ্রদ্ধাভাজন মুখ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলীয় আদর্শে অবিচল থেকে জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যু শুধু কুলিয়ারচর উপজেলা বিএনপির জন্য নয়, পুরো কিশোরগঞ্জ জেলার রাজনীতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।”
রাজনৈতিক সহকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নুরুল মিল্লাত ছিলেন সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের সাথী। সুখ-দুঃখে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।