নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে ২১ জানুয়ারি। নির্বাচন আচরণবিধি অনুযায়ী, এই তারিখের আগে কোনো রাজনৈতিক দল, প্রার্থী কিংবা তাদের পক্ষে কেউ নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন না। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। কিশোরগঞ্জের ছয়টি সংসদীয় আসনে প্রতীক বরাদ্দের আগেই শুরু হয়ে গেছে প্রকাশ্য ও গোপন নির্বাচনী প্রচারণা।
মাঠ পর্যায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনেই প্রতীক বরাদ্দের আগেই প্রকাশ্যে ও গোপনে নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। প্রার্থীরা কৌশলে বিভিন্ন ইউনিয়নে গণসংযোগ করছেন। অনেকে সময়সূচি প্রকাশ করে একেকদিন একেক ইউনিয়নে গণসংযোগ করছেন। এছাড়া দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিসহ সামাজিক অনুষ্ঠান ও হাটবাজারে গিয়ে তারা সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, দোয়া চাচ্ছেন। এ ছাড়া গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর শোকসভার আয়োজন করা হচ্ছে। তবে বড় ধরনের শোডাউন নেই।
বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকরা ফেসবুকসহ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রতীকসংবলিত পোস্টার, ব্যানার ও ভোট প্রার্থনামূলক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। শুধু অনলাইনেই নয়, সড়কের পাশে ও আদালত চত্বরেও পোস্টার দেখা গেছে।
প্রতীক বরাদ্দের আগে নির্বাচনী আচরণবিধিতে পোস্টার ব্যবহারসহ ভোটের প্রচারণা নিষিদ্ধ থাকলেও এসব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকেও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এতে নির্বাচন কমিশনের বিধি প্রয়োগ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনের আগে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার দানাপাটুলী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে মাঠের বাজার থেকে জামাল উদ্দিনের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৫০০ ফুট দীর্ঘ একটি নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) কিশোরগঞ্জ-১ (সদর–হোসেনপুর) আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ মো. মোছাদ্দেক ভূঞা ওই রাস্তার উদ্বোধন করেন। স্থানীয় জামায়াত নেতা মাওলানা আল আমিন তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে রাস্তার অর্থায়ন করেন। এলাকাবাসীর একটি অংশ মনে করছেন, নির্বাচন সামনে রেখে এই উন্নয়ন কাজ ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, যা আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
দানাপাটুলি ইউনিয়নের বাসিন্দা মোঃ নুরুল হক ভূইয়া বলেন, আমাদের এলাকায় একটি রাস্তা নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছে কিশোরগঞ্জ-১ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ মো. মোছাদ্দেক ভূঞা। এমনকি একটি ব্যানারও টাঙানো হয়েছে। তিনি রাস্তা নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করে স্পষ্টত আচরণ বিধি লঙ্ঘন করেছে।
রির্টানিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা জজ কোর্ট কম্পাউন্ডের নিচ তলার পিলারে পোস্টার সাটানোর দায়ে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের মই মার্কার বৈধ প্রার্থী মোঃ মাসুদ মিয়া ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে মার্কার বৈধ প্রার্থী মোঃ এনামুল হককে গত ১২ জানুয়ারি শোকজ করেন নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির বিচারক (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত) মোঃ কাউছার আলম।
তবে অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীদের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতীকসংবলিত পোস্টার প্রকাশ করে ভোট চাইলেও তাঁদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি প্রার্থীরা কৌশলে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন নিয়মিত। শুধু তাই নয় প্রার্থীরা নিয়মিত উঠান বৈঠক পর্যন্ত করছেন বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। জানা গেছে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শোকসভা, গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে নির্বাচনের অনানুষ্ঠানিক প্রচার চালাচ্ছে। জামায়াতের একটি অংশের নারী কর্মীরা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করছেন।
মাঠ পর্যায় ও অনলাইন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কিশোরগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ মো. মোছাদ্দেক ভূঞার সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতীকসংবলিত পোস্টার ও প্রচারমূলক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কিশোরগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জালাল উদ্দিন, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মোড়লের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতীকসংবলিত পোস্টার ও প্রচারমূলক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ড. ওসমান ফারুক, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী কর্ণেল জেহাদ খানের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতীকসংবলিত পোস্টার ও প্রচারমূলক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ফজলুর রহমান, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী রুকন রেজা শেখ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী বিল্লাল আহম্মেদ মজুমদারের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতীকসংবলিত পোস্টার ও প্রচারমূলক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী রমজান আলীর সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতীকসংবলিত পোস্টার ও প্রচারমূলক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী শরীফুল আলমের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতীকসংবলিত পোস্টার ও প্রচারমূলক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
এছাড়া প্রত্যেক প্রার্থীই গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন নিয়মিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রচারণার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতীক বরাদ্দের আগেই প্রচার প্রচারণা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর করতে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন কতটা কঠোর ভূমিকা নেবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ ফারুকুজ্জামান বলেন, প্রতীক বরাদ্দের আগেই প্রতীকসম্বলিত পোস্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে আচরণ বিধি লঙ্ঘন করছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি। অবশ্যই অন্যায় করছে তারা। এতে নির্বাচনী পরিবেশ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এমন হতে থাকলে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন দুষ্কর হয়ে উঠবে। দলমত নির্বিশেষে এগুলো নির্বাচন কমিশনের তদারকি করা উচিত।
এসব বিষয়ে কথা বলতে জেলা বিএনপির সভাপতি ও কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী শরীফুল আলমকে মোবাইলে কল করা হলে তিনি বলেন, এটা দরকার কি ভাই? আমার পক্ষ থেকে কোনো প্রচার নাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও কন্ট্রোল নাই। এটাতো আমরা বলতে পারব না। এটা কমিশন দেখবে এটা আমি জানি না। এই সাক্ষাৎকারই আমি দিতে ইচ্ছুক না। এটা নির্বাচন কমিশনের ব্যাপার। এটা তাঁরা দেখবে।
তিনি আরও বলেন, এটা সারা বাংলাদেশে হইতেছে। কে করতেছে ফেইসবুক কোম্পানিকে বলেন, নির্বাচন কমিশনকে বলেন বন্ধ করে দিতে। এটা কোনো প্রশ্ন হইলো নাকি? এটা কমিশন চিন্তা করবে কি করবে না করবে? এটা আপনার দরকার কি? এগুলো প্রার্থীরা জানেই না, আমরা জানিই না।
এসব বিষয়ে জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী রমজান আলী বলেন, আমিতো এগুলো দেখি নাই। আমি দেখে নেই। পরে মন্তব্য করি। অবশ্যই আমরা আচরণ বিধি মেনে চলবো। আচরণ বিধি মানতেই হবে। সবাইকে আচরণ বিধি মেনে চলতে হবে।
এসব বিষয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো ধরনের প্রচারণা চালাতে পারবে না। করলেই আচরণ বিধি লঙ্ঘন হবে। আপনার কাছে কোনো প্রমাণ থাকলে দিন।