পুলিশের দাবি: রাজনৈতিক চাপ থাকলেও ‘সম্মান বিবেচনায়’ লঘু মামলা
খুলশী থানার পুলিশের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশ ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ
চট্টগ্রাম নগরীতে মাদকের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিক নুরুল আজমকে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে খুলশী থানার পুলিশের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দা, সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের দাবি—মাদক কারবারিদের সঙ্গে আর্থিক ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট যোগসাজশের কারণেই একজন পরিচ্ছন্ন ইমেজের সাংবাদিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তৈরি করা একটি পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে এবং একটি পুরোনো মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি দেখিয়ে সাংবাদিক নুরুল আজমকে গ্রেপ্তার করে খুলশী থানা পুলিশ। অথচ যে মামলায় তাকে জড়ানো হয়েছে, সেই ৫ আগস্টের পুলিশ লাইন ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে পরিবারের দাবি।
ভোরে বাসায় পুলিশ, বিনা ওয়ারেন্টে নেওয়ার চেষ্টা:
ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ৯ তারিখ ভোর ছয়টার দিকে খুলশী থানার এসআই আনোয়ার পুলিশ সদস্যদের নিয়ে নুরুল আজমের বাসায় উপস্থিত হন। ভিডিওতে তাকে ফোনে বিএনপির একজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। এরপর ‘ওসি সাহেব কথা বলবেন’—এই অজুহাতে নুরুল আজমকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বলেন তিনি।
প্রায় ১৭ মিনিটের ওই ভিডিওতে বারবার বিনা ওয়ারেন্টে বাসা থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা, বক্তব্যে অসংগতি এবং প্রক্রিয়াগত ত্রুটি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। একাধিকবার এসআই আনোয়ারকে নুরুল আজমের বেডরুমে ঢুকতে দেখা যায়। সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী, কোলে তিন বছরের শিশু কন্যা এবং বৃদ্ধা মা।
পরিবারের অনুরোধ উপেক্ষা করে তাকে থানায় নেওয়ার ঘটনায় শিশুটি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে—এমন দৃশ্যও ভিডিওতে ধরা পড়ে।
‘ওসি ডাকছে’—কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে উদ্দেশ্য নিয়ে
স্থানীয়দের প্রশ্ন—ভোরবেলায় এভাবে থানার ওসি কেন একজন সাংবাদিককে ডাকবেন? সচেতন নাগরিকদের মতে, পুলিশি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এ ধরনের তৎপরতা সন্দেহজনক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। নেটিজেনরা এসআই আনোয়ারের বক্তব্য ও আচরণকে ‘অপেশাদার’ এবং ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে মন্তব্য করেন। কেউ কেউ মন্তব্যে দাবি করেন, তার আচরণ স্বাভাবিক ছিল না।
পুরোনো ঘটনাকে পুঁজি করে গ্রেপ্তার:
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ১২ বছর আগে একটি মাদকবিরোধী মানববন্ধনে রাজনৈতিক ব্যানারে উপস্থিত থাকার ঘটনাকে পুঁজি করে নুরুল আজমকে থানায় আটক রাখা হয়। অথচ পরবর্তী সময়ে তিনিই নিয়মিতভাবে খুলশী এলাকায় মাদক কারবার, অবৈধ হোটেল ও রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করে আসছিলেন।
স্থানীয়দের দাবি, এসব সংবাদে ক্ষুব্ধ মাদক কারবারিরা পুলিশের একটি অংশের সঙ্গে আঁতাত করে তাকে ‘টার্গেট’ করে।
মাদক কারবারিদের সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশের অভিযোগ:
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, খুলশী থানায় প্রতি মাসে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে নুরুল আজম সোচ্চার হওয়ায় তাকে দমন করতেই এই মামলা দেওয়া হয়েছে।
সূত্র মতে, রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনকারী একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে আর্থিক চুক্তির মাধ্যমে এসআই আনোয়ার এই গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে খুলশী থানার ওসি জাহেদুল ইসলামও মামলার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া ওসির বিরুদ্ধে অবৈধ কার্যক্রমে জড়িত হোটেল ও রেস্টুরেন্ট থেকে নিয়মিত মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে, যা তার প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মন্তব্য:
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে একটি বড় রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে একজন সাংবাদিককে হয়রানি করা এবং ভোরে তার বাসায় পুলিশ পাঠানো পুলিশি আচরণ নয়, বরং ভয়ভীতি প্রদর্শনের শামিল।
তাদের মতে, “রক্ষক যখন ভক্ষক হয়—ঠিক তখনই রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়।”
সাংবাদিক সমাজের প্রতিবাদ:
সাংবাদিক নেতারা বলছেন, একজন সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরনের আচরণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। তারা অবিলম্বে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশের বক্তব্য:
এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। খুলশী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেন, সাংবাদিক নুরুল আজমের বিরুদ্ধে আনা মামলাটি ‘হালকা মাত্রার’ এবং রাজনৈতিক একটি দলের পক্ষ থেকে চাপ ছিল বলেই তাকে মামলার আওতায় আনা হয়েছে। তবে সাংবাদিক হিসেবে তার সম্মান বিবেচনায় নিয়ে গুরুতর কোনো ধারা না দিয়ে অপেক্ষাকৃত লঘু মামলা দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের এই বক্তব্য ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক চাপের কথা স্বীকার করাই প্রমাণ করে যে মামলাটি আইনগত প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ধারায় হয়নি। একজন সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ কাজ করেছে—এমন স্বীকারোক্তি পুলিশ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্ব নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করে।
সাংবাদিক নেতারা বলছেন, “রাজনৈতিক চাপের অজুহাতে মামলা দেওয়া যদি বৈধ হয়, তবে যেকোনো সময় যে কোনো সাংবাদিককে হয়রানি করার পথ খুলে যায়। এটি শুধু একজন সাংবাদিক নয়, পুরো গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি।”
বিনা ওয়ারেন্টে সাংবাদিককে ঘর থেকে বের করে আনা: কতটা বৈধ, কী বলছে আইন-:
কোনো ব্যক্তিকে তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার বা থানায় নেওয়ার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) ও সংবিধানে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, বিনা ওয়ারেন্টে একজন সাংবাদিককে ঘর থেকে বের করে এনে পরবর্তীতে মামলা দেওয়া আইনগতভাবে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
আইন কী বলে?:
আইনজীবীদের মতে, বাংলাদেশে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তার করতে পারে কেবল নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে—
যদি কেউ শাস্তিযোগ্য অপরাধে সরাসরি জড়িত থাকে, অথবা