রেহানা ফেরদৌসী
বিশাল জলরাশির বুকে বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট গ্রাম। যেন একেকটা ছোট ছোট দ্বীপ। হাওরজুড়ে গলা ডুবিয়ে থাকা হিজল গাছের সারি বা পানির নিচ থেকে জেগে ওঠা করচের বন কিংবা শুশুকের লাফ-ঝাঁপ মুহূর্তেই মন ভালো করে দেবে। কিশোরগঞ্জ হাওর এমনই।
মূলত নিকলী উপজেলার হাওর এই নিকলী হাওর। যার নামকরণ করা হয়েছে নিকলী উপজেলার নাম থেকেই। কিশোরগঞ্জের এই উপজেলা থেকে হাওরটির উৎপত্তি হয়েছে। পানি এবং উপরের আকাশের এক অদ্ভুত মিলনমেলা সরাসরি নিজ চোখে উপভোগ করার উদ্দেশ্যে সারাবছরই এই পর্যটন এলাকাটিতে ভীড় লেগেই থাকে। কেননা বর্ষাকালে যেকোনো সময়ে ঘুরে আসার ক্ষেত্রে নিকলী হাওর উপযুক্ত জায়গা ।
কিশোরগঞ্জের এই হাওর মূলত সেখানকার নিকলী, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও ইটনা এই ৪ টি উপজেলার মাঝে বয়ে চলা বড়সড় একটি জলাধার। নিকলী হাওরে ঘুরতে গিয়ে কিছুটা দ্বীপ উপভোগের অনুভূতি পাওয়া যায় । খন্ড খন্ড গ্রাম এবং সে-সব গ্রামের মাঝখানে কোথাও কোথাও হাওরে খন্ডাংশ! এ-যেনো গ্রামের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোনো এক প্রাকৃতিক দ্বীপ!
এ হাওরের মাছ বিক্রি হয় প্রতিদিন শহরের বাজারে। কিন্তু তাদের মূল পেশা কৃষি। শুকনো মৌসুমে হাওর পরিণত হয় উর্বর মাঠে। নানা ধরনের সবজি চাষ হয় তখন পুরো সময়জুড়ে। বেশিরভাগ গ্রামের মতোই শিক্ষার হার এখানেও কম। নৌকায় ঘুরতে ঘুরতে শোনা যাবে গ্রামের শিশুদের মিষ্টি কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান। জেলেদের নৌকা, শিশুদের সাঁতার কাটা আর হাওরের মাঝখানে ছোট-বড় গাছ প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়া বাংলার গ্রামের সৌন্দর্য চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলবে। প্রতি বর্ষায় কিশোরগঞ্জ হাওর ভ্রমণ বিলাসীদের মনে তৈরি করতে থাকবে আকাঙ্ক্ষা।তাই এটি কিশোরগঞ্জ জেলার একটি জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা বা প্রাকৃতিক হাওর।
নৌকা ভাড়া:
সাধারণত এক ঘণ্টার জন্য ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নেয়। আবার কয়েক ঘণ্টার জন্য নিলে সেক্ষেত্রে প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকার মতো করে নেয়। অবশ্যই ভাড়া দামাদামি করে নিতে হবে। এতে আরও কমতে পারে। নৌকাগুলো বেশ বড়সড়ও হয়। ১৫-২০ জন পর্যন্ত অনায়াসে ঘুরে আসা যায় ।নৌকার সাইজ অনুযায়ী ভাড়া খুব একটা কমবেশি হয় না।
নিকলীতে খাবারের ব্যবস্থা:
মূলত নিকলীতে ভালো মানের খুব বেশি খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। তবে বাজারে বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁ আছে। মোটামুটি মানের তাজা মাছের রান্না দিয়ে খেতে ভালোই লাগবে।
রাত কাটানো যায় নৌকায়:
ভরপুর কোনো পূর্ণিমা রাতের গাঢ় নীল আকাশের নিচে নৌকার ছাদে কাটিয়ে দিতে পারা যাবে পুরো একটি রাত। ওখানে রাতে থাকাটা মোটামুটি নিরাপদ। যদি আবহাওয়া ভালো থাকে। তবে পুরোপুরি নিরাপত্তার জন্য নিকলী থানায় যোগাযোগ করে নিতে হবে। তাহলে চিন্তামুক্ত ও আরামদায়ক একটি রাত কাটানো যায় ।রাতে অবশ্যই বেড়িবাঁধের কাছাকাছি কোনো স্থানে অবস্থান করতে হবে। যদিও নিকলীতে ডাঙায় থাকার কোনো সুব্যবস্থা নেই, তবে জরুরি ভিত্তিতে থাকার প্রয়োজন হলে নিকলী থানা পুলিশের আওতায় একটি ডাকবাংলো আছে। জেলা
পুলিশের সঙ্গে কথা বলে সেখানে ব্যবস্থা করে নিতে পারেন। এটাও যদি না হয়, তাহলে তো হাতের কাছে কিশোরগঞ্জ শহর আছেই।
কীভাবে যাওয়া যাবে ?
ঢাকা থেকে যদি ভোরে রওনা করে রাতের মধ্যে চলে আসতে হয়, তাহলে সবচেয়ে সুন্দর পন্থা হচ্ছে পুলেরঘাট দিয়ে যাওয়া। নিকলী হাওর সবচেয়ে বেশি কাছে হয় কিশোরগঞ্জের পুলেরঘাট থেকে। ঢাকার সায়েদাবাদের পাশে গোলাপবাগ বাসস্ট্যান্ড থেকে ‘অনন্যা সুপার’ ও ‘যাতায়াত’ বাসে সোজা পুলেরঘাট। ভাড়া ২২০ টাকা। সময় লাগবে ৩ ঘণ্টা। পুলেরঘাট থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা দিয়ে ১ ঘণ্টায় নিকলী বেড়িবাঁধ। সিএনজিতে জনপ্রতি ভাড়া ৮০ টাকা। গোলাপবাগ থেকে একদম ভোর থেকেই বাস পাওয়া যায় । তবে ভালো থাকা-খাওয়ার চিন্তা করলে সেক্ষেত্রে কিশোরগঞ্জ শহরেই যেতে হবে। নিকলী থেকে কিশোরগঞ্জ শহরে যেতে সিএনজিতে ঘণ্টাখানেক লাগে।
তাছাড়াও কিশোরগঞ্জ শহর ও শহরের আশপাশে আরও কিছু ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন যেমন- ইশা খাঁর বাড়ি, চন্দ্রাবতীর শিবমন্দির, ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ, ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ইত্যাদি দর্শনীয় স্থান রয়েছে ।সেক্ষেত্রে ঢাকা থেকে সরাসরি কিশোরগঞ্জ শহরে চলে যেতে হবে। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে যেতে হবে নিকলী হাওরে।
রেলস্টেশনের দক্ষিণ পাশ থেকে সিএনজি অটোরিকশা যায় নিকলীর দিকে। মাথাপিছু ৮০ টাকা ভাড়ায় মাত্র ১ ঘণ্টায় নিকলী হাওর বেড়িবাঁধে পৌঁছানো যাবে অথবা শহর থেকে চলে যেতে হবে শহরের খুব কাছেই চামড়াবন্দরে। সেখান থেকেও নৌকা ভাড়া করে ঘুরতে পারা যায় হাওরের আরেক পাশ। শহরের একরামপুর রেলক্রসিং থেকে চামড়াবন্দরে যাওয়ার সিএনজি অটোরিকশা বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যায়। সিএনজিতে সময় লাগবে আধা ঘণ্টারও কম। ভাড়া মাথাপিছু ৪০-৫০ টাকা।
কিশোরগঞ্জ হয়ে যেতে চাইলে
গোলাপবাগ বাসস্ট্যান্ড বা মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে ভোর থেকে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের বাস পাওয়া যায়। মহাখালী থেকে ছেড়ে যাওয়া কিশোরগঞ্জের বাসগুলো একটু ছোট টাইপের। অথবা ট্রেনে যাওয়া যায় । কিশোরগঞ্জে যাওয়ার সবচেয়ে আরামদায়ক জার্নি হচ্ছে ট্রেন। সারা দিনে তিনটি আন্তঃনগর ট্রেন ঢাকা-কিশোরগঞ্জ আসা-যাওয়া করে।
বাংলাদেশে যে ক’টি মিঠা পানির জলাধার বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সে ক’টি জলাধারের মাঝে বেশ বড়সড় একটি জলাধার হলো এই নিকলী হাওর । এই হাওর সারাদেশে পর্যটন এলাকা হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠার পেছনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো,হাওরটিতে ভ্রমণ করাকালীন সময়ে ঢাকার সাথে সহজ সড়ক ও রেল যোগাযোগের ফলে যাতায়াত সম্পর্কিত চাপ একেবারেই না থাকা!
তো কবে যাচ্ছেন মাতৃভূমির নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে!
রেহানা ফেরদৌসী
সহসম্পাদক, সমাজ কল্যানবিভাগ,পুলিশ নারী কল্যান সমিতি,
(কেন্দ্রীয় পুনাক)
মোহাম্মদপুর,ঢাকা।
০১৯১১৫০৪৬৩৮