বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু বক্তব্য থাকে, যেগুলো কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়-বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রদর্শনের ইঙ্গিত বহন করে। গত বুধবার (২০ মে) গাজীপুরে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ঠিক তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। তিনি যখন ঘোষণা দেন। “এই বিএনপি সরকারই পদ্মা ব্যারাজের কাজে হাত দেবে; ইনশা আল্লাহ তিস্তা ব্যারাজেও হাত দেবে”-তখন সেটি নিছক উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা থাকে না; বরং বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি অর্থনীতি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই দেশের সভ্যতা, কৃষি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি-সবকিছুই নদীকেন্দ্রিক। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হচ্ছে পানির ন্যায্য প্রাপ্যতা। উজানে একের পর এক বাঁধ, নদী শাসনের অসম নীতি এবং অভিন্ন নদীগুলোর ওপর একতরফা নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলকে ক্রমশ বিপর্যস্ত করে তুলছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে যে বাস্তবতা তুলে ধরেছেন-খরা মৌসুমে পানি না পাওয়া, দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়া-এসব কোনো রাজনৈতিক অলঙ্কার নয়; বরং নির্মম বাস্তবতা। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব নিয়ে বহু বছর ধরেই গবেষণা হচ্ছে। পদ্মা ও গঙ্গা অববাহিকায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন কমেছে, মিঠা পানির মাছ বিলুপ্তির পথে, এমনকি ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিঃসন্দেহে একটি কৌশলগত উদ্যোগ। এটি কেবল কৃষির জন্য পানি সংরক্ষণের প্রকল্প নয়; বরং জলবায়ু অভিযোজনের একটি দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো। বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধরে রেখে খরা মৌসুমে ব্যবহার করার যে পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেছেন, সেটি আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার একটি পরীক্ষিত মডেল। তবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে তিস্তা ব্যারাজের প্রসঙ্গ। তিস্তা ইস্যু বাংলাদেশের মানুষের আবেগ, বঞ্চনা এবং কূটনৈতিক হতাশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর আলোচনা, প্রতিশ্রুতি ও বৈঠক হলেও তিস্তার ন্যায্য পানি বণ্টন নিশ্চিত হয়নি। উত্তরাঞ্চলের কৃষক আজও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে আছেন। কাজেই প্রধানমন্ত্রী যখন তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের কথা বলেন, তখন সেটি রাজনৈতিক সাহসের পরিচায়ক। কারণ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে কেবল অর্থনৈতিক সক্ষমতা নয়, প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও জাতীয় ঐক্য।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট নিয়ে তাঁর উদ্বেগ। তিনি শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে বর্তমান আবহাওয়ার তুলনা টেনে যে পরিবর্তনের কথা বলেছেন, তা সাধারণ মানুষের অনুভূতির সঙ্গেও মিলে যায়। জানুয়ারিতে শীত কমে যাওয়া, নগরায়ণের ফলে গাছপালা উধাও হয়ে যাওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া—এসবই জলবায়ু পরিবর্তনের দৃশ্যমান লক্ষণ।
বিশেষ করে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বনভূমি ধ্বংসের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানবিক কারণে বাংলাদেশ লাখো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু এর পরিবেশগত মূল্যও কম নয়। হাজার হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে, জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক সংকট নয়; এটি পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক সংকটও।
প্রধানমন্ত্রী যখন একটি রাস্তা নির্মাণের জন্য তিন হাজার গাছ কাটার প্রস্তাবে আপত্তি জানান, তখন সেখানে একটি নতুন রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হয়-উন্নয়ন মানেই নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংস নয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শনে এতদিন “কংক্রিটকেন্দ্রিক উন্নয়ন” প্রবল ছিল। এখন সময় এসেছে “সবুজ উন্নয়ন” ধারণাকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার। খাল খনন কর্মসূচির প্রসঙ্গও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে খাল ছিল প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের প্রাণশক্তি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল ও অব্যবস্থাপনায় সেই খালগুলো হারিয়ে গেছে। ফলে একদিকে জলাবদ্ধতা বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষি সংকট তীব্র হচ্ছে। খাল পুনঃখনন কেবল পানি ব্যবস্থাপনা নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনেরও একটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে।
তবে এখানে একটি বড় প্রশ্নও রয়েছে।
বাংলাদেশে বহু প্রকল্প রাজনৈতিক ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। পদ্মা ব্যারাজ বা তিস্তা ব্যারাজের মতো বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, দক্ষতা, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনগণের প্রত্যাশা বাড়ানো সহজ; কিন্তু বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশ আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা কিংবা ভূমিকম্প—সবকিছুর জন্য একটি আধুনিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কাঠামো এখন সময়ের দাবি।
সবশেষে বলতে হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে উন্নয়ন, পরিবেশ, পানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু সচেতনতার যে সমন্বিত চিত্র উঠে এসেছে, সেটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিতে পারে। কিন্তু জনগণ এখন শুধু ঘোষণা শুনতে চায় না; তারা বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়।
পদ্মা ও তিস্তা বাংলাদেশের শুধু নদী নয়—এগুলো বাংলাদেশের জীবনরেখা। এই জীবনরেখা রক্ষার সংগ্রামই আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
— রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
২১ মে ২০২৬ ইং