লেখক: রেহানা ফেরদৌসী
সময় কখনো থেমে থাকে না—কিন্তু সব সময় একরকম নয়। কিছু সময় আসে, যা মানুষের জীবনকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আসন্ন যিলহজ্ব মাস তেমনই এক সময়, যা কেবল একটি ধর্মীয় পর্ব নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য সুযোগ।
ইসলামে যিলহজ্বের প্রথম দশ দিনকে বছরের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সময়ে নেক আমলের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—এই দশ দিনের আমল আল্লাহর কাছে অন্য সব সময়ের আমলের চেয়েও অধিক প্রিয়।এই হাদিসটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে…সময়েরও মান আছে। আর এই দশ দিন সেই মানের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করছে।পবিত্র কুরআনে “দশ রাতের” শপথ এই সময়ের গুরুত্বকে আরও দৃঢ় করে। আল্লাহ যে বিষয়ের শপথ করেন, তা কখনোই সাধারণ নয়। ফলে এই দশ দিনকে অবহেলা করা মানে একটি ঐশী আহ্বানকে অগ্রাহ্য করা।এই সময়ের বিশেষত্ব হলো—এতে বিভিন্ন ধরনের ইবাদত একত্রিত হয়। সালাত, সিয়াম, যিকির, সদকা, হজ ও কুরবানি—ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলো একই সময়ে উপস্থিত থাকে।ফলে এটি কেবল একটি সময় নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণক্ষেত্র, যেখানে একজন মুমিন তার জীবনের প্রতিটি দিককে আল্লাহমুখী করতে পারে।আত্মসমর্পণ ও ত্যাগের চূড়ান্ত প্রতীক যিলহজ্বের দশ দিনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিন—আরাফা ও কুরবানি।আরাফার দিনকে ক্ষমা ও মুক্তির দিন বলা হয়। এই দিনে আল্লাহ অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। অন্যদিকে, কুরবানির দিন আমাদের শেখায় নিঃশর্ত আনুগত্য ও ত্যাগ—যেখানে নিজের প্রিয়তম জিনিসকেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করতে হয়।রমজানের মতো এই সময়ে শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে না। ফলে ইবাদত করা তুলনামূলক কঠিন হয়। কিন্তু এই কঠিনতাই আমলের মূল্যকে বাড়িয়ে দেয়।
এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক প্রতিযোগিতা—যেখানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কম, কিন্তু পুরস্কার অসীম।
সচেতন মুমিনের প্রস্তুতিমূলক কর্মপন্থা
১. তাওবা: অতীত ভুল থেকে ফিরে এসে নতুনভাবে শুরু করা।
২. সালাত: ফরজ নামাজে দৃঢ়তা ও নফল ইবাদতে অগ্রগতি।
৩. সিয়াম: বিশেষত আরাফার রোজা রাখা।
৪. যিকির: তাকবির, তাহলিল ও তাহমিদে নিজেকে অভ্যস্ত করা।
৫. সদকা: গোপন দান ও সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন।
৬. কুরবানি: ত্যাগের চেতনাকে বাস্তবায়ন করা।
৭. নিয়ত: প্রতিটি কাজকে ইবাদতে রূপান্তরিত করার মূল ভিত্তি।
বিশেষ সতর্কতা
যিনি কুরবানির নিয়ত করেছেন, তিনি যিলহজ্জের চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানি করা পর্যন্ত চুল, নখ ও শরীরের পশম কাটবেন না। [মুসলিম] এটা রাসূল (সাঃ) এর সুস্পষ্ট নির্দেশ।
যিলহজ্বের চাঁদ উঠতে আর বেশি দেরি নেই। এই অল্প সময়টাই আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির সময়।কারণ, এই দশ দিন কেবল আরেকটি সময় নয়—এটি হতে পারে আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত।আজই সিদ্ধান্ত নিন। নিজেকে প্রস্তুত করুন—অন্তরে, চিন্তায় ও আমলে।হয়তো এই দশ দিনই আপনার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়ার সূচনা হয়ে উঠবে।
“তোমরা কল্যাণের কাজে প্রতিযোগিতা করো।” [সূরা বাকারা: ১৪৮]প্রতিযোগিতা শুরু হোক আজ, এখনই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই বরকতময় সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফিক দান করুন এবং কবুল করুন…আমিন।