মাইনুল হক মেনু, স্টাফ রিপোর্টার:
খেলা যদি হয় পেশা, তবে পরিবার পাবে ভরসা। খেলাধুলার মাধ্যমে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। যুব সমাজকে সুস্থ, সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে খেলাধুলার বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন ও তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের অষ্টঘড়িয়া এলাকায় পাপ্পু ক্রীড়া চক্র আয়োজিত ৩৩তম লক্ষ টাকা প্রাইজমানি ও ফ্রি গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম।
শুক্রবার বিকেলে আচমিতা জর্জ ইন্সটিটিউশন মাঠে অনুষ্ঠিত এই ফাইনাল ম্যাচকে ঘিরে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক মিলনমেলায়। খেলা শুরুর নির্ধারিত সময় ছিল বিকেল ৪টা। তবে সকাল থেকেই আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা থেকে দর্শকরা মাঠে আসতে শুরু করেন। দুপুরের পর থেকেই মাঠ ও তার আশপাশের এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। মাঠের চারপাশ, রাস্তার ধারে, ভবনের ছাদ, এমনকি গাছের ডালেও অবস্থান নিয়ে হাজারো দর্শক খেলা উপভোগ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের খেলাধুলার মানোন্নয়নে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নতুন কুঁড়ি ক্লাবের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নতুন নতুন খেলোয়াড় তৈরির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে যুব সমাজের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ মাদকাসক্তি। খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে তরুণরা মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকে। তাই প্রতিটি গ্রাম, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও ক্রীড়াপ্রেমী মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, খেলাধুলা শুধু শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে না, বরং একজন মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ, নেতৃত্বগুণ, সহনশীলতা, দলগত মনোভাব ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে। একটি সুস্থ ও উন্নত জাতি গঠনে খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ও খেলার উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, খেলাধুলা যুবসমাজের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি মাদকমুক্ত, সুস্থ ও আধুনিক সমাজ গঠনে ক্রীড়াচর্চার বিকল্প নেই। তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি আরও বেশি আগ্রহী করে তুলতে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কটিয়াদী উপজেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন খান দিলীপ। প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও আচমিতা জর্জ ইন্সটিটিউশনের সভাপতি আশরাফ আহমেদ জুন। এছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, সমাজসেবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হয় বোয়ালিয়া ফুটবল একাডেমি ও বেতাল ছুবেজ্জামান একাদশ। শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে উভয় দলই দেশি-বিদেশি তারকা খেলোয়াড়দের নিয়ে শক্তিশালী দল গঠন করে মাঠে নামে। নাইজেরিয়া ও উগান্ডার একাধিক বিদেশি খেলোয়াড়ের পাশাপাশি জাতীয় দলের কয়েকজন খেলোয়াড় অংশ নেওয়ায় ম্যাচটি ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে।
খেলার শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয়। পুরো ৯০ মিনিট জুড়ে পাল্টাপাল্টি আক্রমণে মাঠে উত্তেজনা বিরাজ করলেও কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। ফলে নির্ধারিত সময় শেষে ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হলে শিরোপা নির্ধারণে ট্রাইব্রেকারের আয়োজন করা হয়।
টানটান উত্তেজনাপূর্ণ ট্রাইব্রেকারে বোয়ালিয়া ফুটবল একাডেমি ১-০ গোলে বেতাল ছুবেজ্জামান একাদশকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। মাঠজুড়ে শুরু হয় উল্লাস, করতালি ও বিজয় উৎসব।
খেলা শেষে অতিথিবৃন্দ চ্যাম্পিয়ন ও রানার-আপ দলের হাতে ট্রফি, মেডেল ও নগদ পুরস্কার তুলে দেন। এ সময় বিজয়ী দলের খেলোয়াড়দের ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। দর্শকরাও করতালির মাধ্যমে খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানান।
স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পাপ্পু ক্রীড়া চক্র অষ্টঘড়িয়া এ ধরনের বড় আয়োজনের মাধ্যমে এলাকায় ফুটবল চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে টুর্নামেন্ট আয়োজন করায় আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তারা।
ফাইনাল ম্যাচকে কেন্দ্র করে পুরো অষ্টঘড়িয়া এলাকায় ছিল উৎসবের আমেজ। খেলা উপভোগ করতে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হন। স্থানীয়দের মতে, এটি সাম্প্রতিক সময়ে কটিয়াদী অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও দর্শকসমাগমপূর্ণ ফুটবল আয়োজনগুলোর একটি।