রেহানা ফেরদৌসী
স্বাগত হে জৈষ্ঠ্য— তোমার দহনেও থাকুক জীবনের মধুরতা, তোমার রৌদ্রেও নেমে আসুক প্রশান্তির বৃষ্টি।
প্রচণ্ড খরতাপ, কালবৈশাখীর অস্থিরতা, আম-কাঁঠালের মাদকতা আর গ্রামীণ জীবনের অর্থনৈতিক স্পন্দনে জৈষ্ঠ্য শুধু একটি মাস নয়— এটি বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জীবনচক্রের এক গভীর বাস্তব প্রতিচ্ছবি।আজ বাংলা সনের জৈষ্ঠ্য মাসের প্রথম দিন। গ্রীষ্মের শেষ অধ্যায়ের সূচনা যেন প্রতি বছর নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় প্রকৃতির কঠোরতা ও উদারতার যুগলবন্দি।
বাংলা বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় মাস জৈষ্ঠ্য— লোকমুখে জেঠ বা জ্যৈষ্ঠ নামেও পরিচিত— একদিকে যেমন বছরের সবচেয়ে উষ্ণ সময়গুলোর একটি, অন্যদিকে তেমনি ফলের সমারোহে ভরা “মধু মাস” হিসেবেও সুপরিচিত।
“এই গ্রীষ্মের দাহে স্নিগ্ধ হবার আশায়,
বৃষ্টি নামে আকুল পিয়াসায়…”
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর পঙক্তিতে যেমন গ্রীষ্মের দহন শেষে বৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি জৈষ্ঠ্যও যেন প্রতীক্ষার প্রতীক। এই মাস প্রকৃতিকে যেমন কঠোর করে তোলে, তেমনি জীবনকেও নতুন রস ও সম্ভাবনায় পূর্ণ করে।
বাংলাদেশের আবহাওয়াগত প্রেক্ষাপটে বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য— এই দুই মাস মিলেই গ্রীষ্মকাল। তবে বৈশাখের উচ্ছ্বাসের তুলনায় জৈষ্ঠ্যের চরিত্র আরও তীব্র, আরও দহনময়। এ সময় তাপমাত্রা অনেক অঞ্চলে ৩৮ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বাতাসে আর্দ্রতা কমে রুক্ষতা বেড়ে যায়, খাল-বিল ও ছোট নদীগুলো শুকিয়ে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। কৃষিজমিতে দেখা দেয় খরার প্রভাব, জনজীবনে বাড়ে দুর্ভোগ।
জৈষ্ঠ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘ দিন ও প্রখর সূর্যতাপ। দুপুরের রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক কিংবা কৃষক— সকলের জীবনেই এই তাপদাহ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। নগরজীবনে লোডশেডিং, বিদ্যুৎ সংকট ও পানির চাহিদা বেড়ে যায় বহুগুণে। অতিরিক্ত গরমে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন।
তবে প্রকৃতি তার রুক্ষতার মাঝেও সৌন্দর্য ছড়াতে ভোলে না। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া ও পলাশের অগ্নিরাঙা ফুলে ছেয়ে যায় শহর ও গ্রামের পথঘাট। তপ্ত রোদের ভেতরেও এই ফুলগুলো যেন প্রকৃতির নিজস্ব প্রতিবাদী রূপ। আবার হঠাৎ কালো মেঘের আনাগোনা, দূরে বিদ্যুতের ঝলকানি কিংবা কালবৈশাখীর তাণ্ডব— জৈষ্ঠ্যের আবহকে করে তোলে আরও নাটকীয়।
জৈষ্ঠ্যকে বলা হয় “আম-কাঁঠালের মাস”। এই সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গাছে গাছে পাকে হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, গোপালভোগ, লক্ষণভোগ, বোম্বাই ও আম্রপালিসহ অসংখ্য জাতের আম। বিশেষ করে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চলের অর্থনীতি আমকে কেন্দ্র করে প্রাণ ফিরে পায়। আম সংগ্রহ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানির সঙ্গে জড়িত লাখো মানুষের কর্মব্যস্ততায় মুখর হয়ে ওঠে জনপদ।
একই সময়ে জাতীয় ফল কাঁঠালও পরিপক্ব হয়। গ্রামীণ জীবনে কাঁঠালের গুরুত্ব শুধু খাদ্য হিসেবেই নয়; এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিরও অংশ। গাছভর্তি কাঁঠাল যেন বাংলার গ্রামীণ ঐশ্বর্যের প্রতীক। অনেক পরিবারে এই সময় কাঁঠাল বিক্রির আয় সংসারের বাড়তি সহায়তা এনে দেয়।
শুধু ফল নয়, জৈষ্ঠ্যকে ঘিরে রয়েছে নানা লোকজ ঐতিহ্য ও উৎসব। “আম কুড়ানি”, “আম উৎসব”, “আম মেলা”— এসব আয়োজন এখন অনেক অঞ্চলে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমমেলা দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। এসব উৎসব স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিকে যেমন উৎসাহিত করে, তেমনি আঞ্চলিক সংস্কৃতিকেও সমৃদ্ধ করে।
জৈষ্ঠ্য মাসে পালিত হয় “জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তি”। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার। এ উপলক্ষে অনেক পরিবারে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ, পূজা ও পিতৃভোজের আয়োজন করা হয়। ফলে এই মাস কেবল প্রকৃতির নয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
জৈষ্ঠ্যের অর্থনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। কৃষকের জন্য এই মাস যেমন ফলন ও আয়ের সময়, তেমনি সংগ্রামেরও সময়। অতিরিক্ত গরমে ফসলি জমি টিকিয়ে রাখতে সেচব্যবস্থা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। পানি সংকট ও বিদ্যুতের ঘাটতি কৃষিকাজে প্রভাব ফেলে। তবুও কৃষকের শ্রমেই শহরের বাজারগুলো ভরে ওঠে মৌসুমি ফলের বাহারে।
শহুরে জীবনে জৈষ্ঠ্য মানেই একদিকে ভোগান্তি, অন্যদিকে ভিন্ন স্বাদের আনন্দ। বাজার, সুপারশপ ও ফলের দোকানগুলো রঙিন হয়ে ওঠে আম, কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ ও আনারসের সমারোহে। অনেকে এই সময় গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যান— আমবাগানে ঘুরে বেড়ানো, গাছ থেকে ফল পাড়া কিংবা শৈশবের স্মৃতি খুঁজে ফেরার আনন্দে।
তবে জৈষ্ঠ্যের এই সৌন্দর্যের মাঝেও স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা, হিট স্ট্রোক, ডায়রিয়া ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, এ সময় পর্যাপ্ত পানি, ঘোল, ডাবের পানি ও লেবুর শরবত পান করা জরুরি। রাস্তার খোলা খাবার ও অস্বাস্থ্যকর শরবত এড়িয়ে চলাও প্রয়োজন। আমে রয়েছে ভিটামিন এ ও সি, আর কাঁঠালে রয়েছে ফাইবার, ক্যালসিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট— যা শরীরের পুষ্টি ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
প্রকৃতির প্রতিটি ঋতুরই নিজস্ব ভাষা আছে। জৈষ্ঠ্যের ভাষা দহনময় হলেও তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে জীবনের মাধুর্য। এই মাস যেন মানুষকে শেখায়— প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবন তার সৌন্দর্য হারায় না। তীব্র রোদ্দুরের পর যেমন বৃষ্টি আসে, তেমনি কঠিন সময়ের পরও ফিরে আসে স্বস্তি।
তাই জৈষ্ঠ্য কেবল একটি ঋতুচক্রের অংশ নয়; এটি বাংলার কৃষি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, লোকজ ঐতিহ্য ও জীবনবোধের এক বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি।
“মধু মাস” তাই শুধু ফলের মৌসুম নয়— এটি দহন ও মাধুর্যের একসাথে বেঁচে থাকার গল্প।আনন্দে ভরে উঠুক,
নিরাপদ থাকুক প্রতিটি জীবন।