বিশেষ সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন নির্বাচিত সরকারের সংস্কার যাত্রা এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং একদলীয় সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রে সুশাসন নিশ্চিত করার যে ম্যান্ডেট সাধারণ মানুষ দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হয়েছে এখন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা ও 'জুলাই জাতীয় চার্টার'-এর মূল চেতনাকে ধারণ করে একটি টেকসই আইনি ভিত্তি দেওয়া বর্তমান সংসদের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক সমীকরণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য
সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সামনে এখন প্রধান কাজ হলো সংস্কার প্রক্রিয়াকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখা। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উপস্থিতি এবং মাঠপর্যায়ের প্রভাব ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় মব জাস্টিস রোধ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূরীকরণ এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বকীয়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শ্লথগতি বা রাজনৈতিক আপস জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও সীমান্ত চ্যালেঞ্জ
নতুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে "বাংলাদেশ ফার্স্ট" নীতির প্রতিফলন এখন সময়ের দাবি। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভারতে অবস্থান এবং প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দিল্লির সাথে ঢাকা'র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা সুকঠিন কূটনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট, মাদক ও মানবপাচার রোধ এবং চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সাথে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার ওপরেই বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা নির্ভর করছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার সুকঠিন সমীকরণ
জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের সবচেয়ে বড় লিটমাস টেস্ট হলো বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে ওঠা। সাম্প্রতিক ডেটা অনুযায়ী বার্ষিক পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.২৬ শতাংশে নেমে এসেছে, তবুও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের উচ্চমূল্য (৯.৩২%) নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতাকে সংকটে রেখেছে। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, পলিসি সার্টেনটি এবং প্রান্তিক অর্থনীতিতে ডিজিটাল লেনদেন চালুর মাধ্যমে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা এখন সময়ের দাবি।
সুশাসনের জন্য পরবর্তী করণীয়
১. সংস্কারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: নির্বাচনী ব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC) এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনের আধুনিকায়নে গঠিত কমিশনগুলোর সুপারিশ দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা: কোনো গোষ্ঠী বা দল যেন রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে সীমান্ত এলাকায় বা দেশের ভেতরে মাইনরিটি বা কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে, সেজন্য জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
৩. অর্থনৈতিক স্বস্তি: পলিসি রেট বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্য সরবরাহ চেইনের মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে।
প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, কিন্তু ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি নতুন ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া অত্যন্ত দুরূহ। বাংলাদেশ আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের ঊর্ধ্বে রেখে এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে যদি প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন ও শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবেই কেবল এই সংস্কার যাত্রা সফল হবে এবং একটি বৈষম্যহীন ও সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.
imunify-bot-check