লেখাঃরেহানা ফেরদৌসী
৫ সেপ্টেম্বর—মানবসেবার এক অনন্য প্রতীক মাদার তেরেসার প্রয়াণ দিবস। ১৯৯৭ সালের এই দিনে কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার প্রয়াণের এই বিশেষ দিনটিকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করেই এই লেখা।
মাদার তেরেসা—নামটি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীলপাড় সাদা শাড়ি পরিহিত এক সেবাব্রতী নারীর ছবি। মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে যিনি বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিলেন ভালোবাসা, মমতা ও নিঃস্বার্থ সেবার প্রতীক। দরিদ্র, অসহায়, অসুস্থ ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তার জীবনের অন্যতম প্রধান ব্রত।
মাদার তেরেসা ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের স্কোপিয়ে শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মনাম ছিল আগনেস গঞ্জে বয়াজিউ (Agnes Gonxha Bojaxhiu)। আলবেনীয় বংশোদ্ভূত এই নারী পরবর্তীকালে ভারতকে তার কর্মভূমি হিসেবে বেছে নেন এবং মানবসেবার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
মাদার তেরেসা—নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীলপাড় সাদা শাড়ি পরিহিত এক সেবাব্রতী নারীর ছবি। মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে যিনি বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিলেন ভালোবাসা, মমতা ও নিঃস্বার্থ সেবার প্রতীক। দরিদ্র, অসহায়, অসুস্থ ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তার জীবনের অন্যতম প্রধান ব্রত।
মাদার তেরেসা ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের স্কোপিয়ে শহরে জন্মগ্রহণ করেন, যা বর্তমানে উত্তর মেসিডোনিয়ার রাজধানী। তার জন্মনাম ছিল আগনেস গঞ্জে বয়াজিউ (Agnes Gonxha Bojaxhiu)। আলবেনীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে বেড়ে ওঠা গঞ্জের শৈশবেই দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতার বোধ তৈরি হয়।
১৮ বছর বয়সে তিনি নিজ দেশ ছেড়ে আয়ারল্যান্ডে লোরেটো সিস্টার্সে যোগ দেন। পরে ভারতে আসার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে আয়ারল্যান্ড থেকে যাত্রা করেন এবং ৬ জানুয়ারি ১৯২৯ কলকাতায় পৌঁছান। ভারতে এসে তিনি লোরেটো সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৩১ সালে প্রথম ধর্মীয় ব্রত গ্রহণ এবং ১৯৩৭ সালে চূড়ান্ত ব্রত গ্রহণের পর তিনি ‘মাদার তেরেসা’ নামে পরিচিত হন।
কলকাতায় শিক্ষকতা ও পরবর্তী সময়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শহরের দরিদ্র মানুষের জীবন তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ১৯৪৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দার্জিলিং যাওয়ার পথে ট্রেনযাত্রায় তিনি যে আধ্যাত্মিক আহ্বান অনুভব করেছিলেন, সেটিকে তিনি তার জীবনের “call within a call” হিসেবে বর্ণনা করেন। এর পরই দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে সরাসরি কাজ করার আকাঙ্ক্ষা আরও দৃঢ় হয়।
১৯৪৮ সালে তিনি লোরেটো কনভেন্টের জীবন ছেড়ে কলকাতার বস্তি ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে কাজ শুরু করেন। দরিদ্র শিশুদের জন্য খোলা আকাশের নিচে স্কুল পরিচালনা থেকে শুরু করে অসুস্থ, পরিত্যক্ত ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবা—ধীরে ধীরে তার কাজের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে। তার সাবেক কয়েকজন ছাত্রীও পরবর্তীকালে তার সঙ্গে যোগ দেন।
এই সেবাকর্মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর কলকাতায় ‘Missionaries of Charity’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের মানবিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া। পরবর্তীকালে এই সংগঠনের কার্যক্রম ভারত ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত হয়।
মিশনারিজ অব চ্যারিটির জীবনদর্শনের কেন্দ্রে ছিল দারিদ্র্য, পবিত্রতা ও আনুগত্যের ব্রতের পাশাপাশি সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ ও পূর্ণাঙ্গ সেবার অঙ্গীকার। তাদের কাজের ক্ষেত্রের মধ্যে ছিল অনাথ ও পরিত্যক্ত শিশুদের জন্য আশ্রয়, অসুস্থ ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবা, দরিদ্রদের জন্য খাদ্য ও আশ্রয় এবং বিভিন্ন মানবিক সহায়তা।
মাদার তেরেসার কাছে সেবা ছিল কেবল দান নয়; মানুষের মর্যাদা, ভালোবাসা ও মানবিক অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া। ১৯৭৯ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল কমিটি তার দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের মানবিক কাজকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পুরস্কার গ্রহণের সময়ও তিনি নিজেকে নয়, দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের কথা সামনে এনেছিলেন।
জীবনের শেষ পর্যায়েও শারীরিক অসুস্থতা তার সেবাকর্মকে থামিয়ে দিতে পারেনি। ১৯৯০-এর দশকে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলেও তিনি মিশনারিজ অব চ্যারিটির কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অবশেষে ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ কলকাতায় ৮৭ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর ভারত সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানায়। তাকে কলকাতার Mother House-এ সমাহিত করা হয়।
মাদার তেরেসার জীবন নিয়ে নানা মত ও মূল্যায়ন থাকলেও তার মানবসেবার ব্যাপ্তি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসহায়কে আশ্রয় দেওয়া এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মর্যাদাবোধ জাগিয়ে তোলার যে বার্তা তিনি রেখে গেছেন, তা আজও বিশ্বের বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। তার প্রতিষ্ঠিত Missionaries of Charity এখনও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছে।
মানুষের পরিচয়, ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে আহ্বান তিনি রেখে গেছেন, সেটিই তার জীবনদর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। তাই মাদার তেরেসা শুধু একটি নাম নন—তিনি নিঃস্বার্থ সেবার এক বিশ্বজনীন প্রতীক।
সেবা যখন হৃদয়ের ভাষা হয়ে ওঠে, তখন একজন মানুষও হয়ে উঠতে পারেন অসংখ্য মানুষের আশ্রয়। মাদার তেরেসার জীবন সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ৫ সেপ্টেম্বর তাই শুধু একটি মৃত্যুর তারিখ নয়; মানবতার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা এক জীবনের স্মরণদিন। মাদার তেরেসার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি হৃদয়ও অসংখ্য মানুষের জীবনে আশ্রয়, ভালোবাসা ও আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.