রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতন্ত্র এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তেমনই একটি বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবস্থাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ, আন্দোলন, নির্বাচন বর্জন, সহিংসতা এবং সাংবিধানিক বিতর্কের ইতিহাস রয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) আইনমন্ত্রীর ঘোষণা—আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে—দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চ আদালতের রায় এবং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে ঘিরে নতুন বাস্তবতা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হচ্ছে জনগণের ভোটাধিকার। জনগণ যদি বিশ্বাস করতে না পারে যে তাদের ভোট স্বাধীনভাবে দেওয়া এবং সঠিকভাবে গণনা করা হবে, তবে নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামো যতই শক্তিশালী হোক না কেন, জনগণের আস্থা ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না। বাংলাদেশে গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই আস্থার সংকট। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের অবস্থান ছিল, সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব। এই দ্বন্দ্ব দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিন অচলাবস্থার মধ্যে রেখেছে।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা একসময় রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে চালু হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখা এবং ভোটারদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করা। এই ব্যবস্থার অধীনে কয়েকটি নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলেও বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ব্যবস্থাও নানা বিতর্কের মুখে পড়ে। পরবর্তীতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এটি বাতিল করা হলে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়। সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলে।বর্তমান পরিস্থিতিতে উচ্চ আদালতের রায়ের পর আইনমন্ত্রীর বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। তবে একটি ঘোষণা নিজেই সমাধান নয়; এর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠিত হবে, এর ক্ষমতার সীমা কী হবে, কতদিন দায়িত্ব পালন করবে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন হবে—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট ও সর্বসম্মত উত্তর প্রয়োজন। শুধু একটি নাম পরিবর্তন করে নয়, বরং এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে সব রাজনৈতিক দল এবং সর্বোপরি জনগণ আস্থা রাখতে পারে।আইনমন্ত্রী যে জনমত যাচাই ও গণভোটের কথা বলেছেন, সেটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি সংবিধান কেবল আইনবিদ বা রাজনীতিবিদদের দলিল নয়; এটি জনগণের সামাজিক চুক্তি। তাই সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে এ অংশগ্রহণ যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। নাগরিক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, আইনজ্ঞ, সাংবাদিক, তরুণ প্রজন্ম, নারী প্রতিনিধি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের মতামতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের শেখায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘাতের মূল্য সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষা ব্যাহত হয়, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফলে নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়, তবে সেটি হবে ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এ ব্যবস্থাকে কোনো রাজনৈতিক দলের জয় বা পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং গণতন্ত্রের একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।এখানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বহু দেশে নির্বাচনকালীন সরকার ভিন্ন হলেও একটি স্বাধীন, শক্তিশালী এবং পেশাদার নির্বাচন কমিশনই অবাধ নির্বাচনের প্রধান নিশ্চয়তা হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশেও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং রাজনৈতিক চাপমুক্ত অবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ নিরপেক্ষ সরকার থাকলেও যদি নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হয়, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন কঠিন হবে।সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আদালতের রায়ও একটি নতুন সাংবিধানিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। আদালত যে বিষয়গুলোতে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেগুলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা উচিত। একই সঙ্গে সংবিধানের মৌলিক চেতনা—গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য—অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। সংবিধানকে কখনোই স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধার হাতিয়ার বানানো উচিত নয়।গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; নির্বাচন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বাচনের পাশাপাশি শক্তিশালী সংসদ, কার্যকর বিরোধী দল, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম এবং সক্রিয় নাগরিক সমাজও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি নির্বাচন অবাধ হয় কিন্তু নির্বাচনের পর জবাবদিহি না থাকে, তবে গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। আবার শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।আজকের তরুণ প্রজন্ম একটি ভিন্ন বাংলাদেশ দেখতে চায়। তারা রাজনৈতিক সংঘাত নয়, স্থিতিশীলতা চায়; সহিংসতা নয়, প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি চায়; অবিশ্বাস নয়, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র চায়। এই প্রত্যাশাকে সম্মান জানাতে হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে পারস্পরিক সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতভেদ যেন রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থায় রূপ না নেয়।আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করবে। তবে বাস্তবে জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অর্থবহ হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাই শেষ পর্যন্ত সংস্কারের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, যেসব দেশে নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক সমঝোতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একসঙ্গে কাজ করেছে। কোনো একক পদ্ধতি সব দেশের জন্য উপযোগী নয়। বাংলাদেশেরও নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংবিধানিক কাঠামো এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সেই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে জনগণের আস্থা।সবশেষে বলা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। তবে এটি কেবল একটি সূচনা। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর—সংলাপ কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, সাংবিধানিক সংস্কার কতটা গ্রহণযোগ্য হয়, নির্বাচন কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং সর্বোপরি জনগণ কতটা বিশ্বাস করতে পারে যে তাদের ভোটই সরকার গঠনের একমাত্র ভিত্তি।গণতন্ত্রের শক্তি কোনো ব্যক্তি বা দলের মধ্যে নয়; এর শক্তি নিহিত থাকে জনগণের সম্মতি, আইনের শাসন এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। যদি নতুন উদ্যোগ সেই ভিত্তিগুলোকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে, তবে এটি কেবল একটি নির্বাচনব্যবস্থার পরিবর্তন হবে না; বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে পারে।
☞বিশিষ্ট লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.