রেহানা ফেরদৌসী
২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে বিশেষ প্রতিবেদন। আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য বিষয় “বিশ্ব মাদক সমস্যা: চলমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং উদ্ভাবনী সমাধান"
একজন বাবা নিজের সন্তানকে হত্যা করেছেন। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষ থেকে পৌঁছে গেছেন পুনর্বাসন কেন্দ্রে। একজন মা শেষ সম্বল জমি বিক্রি করেও ছেলেকে নেশার অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায়, আদালতের নথিতে, হাসপাতালের বেডে কিংবা অসংখ্য পরিবারের নিভৃত কান্নায় ফিরে ফিরে আসে একই শব্দ—মাদক।
আজ ২৬ জুন, আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—শুধু সেমিনার, ব্যানার আর র্যালি কি এই ভয়াবহ সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট?
কারণ মাদক এখন আর কেবল একজন ব্যক্তির নেশা নয়; এটি একটি সামাজিক মহামারি, যা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি এবং জাতির ভবিষ্যৎ।
মাদক নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই আমরা সংখ্যা শুনি—লাখ লাখ আসক্ত, কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য, শত শত মামলা কিংবা অসংখ্য উদ্ধার অভিযান। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি মানুষের গল্প, একটি পরিবারের বেদনা, একটি অপূর্ণ স্বপ্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো তরুণদের সম্পৃক্ততা। কিশোর, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী তরুণ, এমনকি বিদ্যালয়গামী অনেক শিক্ষার্থীও মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। যে প্রজন্ম দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ হওয়ার কথা, সেই প্রজন্মের একটি অংশ ধীরে ধীরে নেশার জালে আটকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের বিস্তার দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে আলোচিত মাদক হলো ইয়াবা, যা মূলত মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে তৈরি। অল্প সময়ের জন্য এটি কৃত্রিম উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ক ও শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে।
এর পাশাপাশি ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), কোকেইন, এলএসডি, বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় ট্যাবলেট এবং নতুন প্রজন্মের কিছু সিনথেটিক মাদকও দেশে প্রবেশ করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক ব্যবসায়ীরা সময়ের সঙ্গে কৌশল বদলাচ্ছে। আগে যেখানে সীমান্তভিত্তিক সরবরাহ বেশি ছিল, এখন অনলাইন যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গোপন ডেলিভারি নেটওয়ার্কও ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে যেমন বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারীদের কাছেও এটি একটি সংবেদনশীল অঞ্চল।
দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলকে বহুবার মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে ভারত সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা এবং অন্যান্য মাদক প্রবেশের ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উঠে এসেছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মাদক চক্র বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, কনটেইনার পরিবহন, কুরিয়ার সার্ভিস এবং ট্রানজিট ব্যবস্থাকেও ব্যবহার করার চেষ্টা করে। ফলে মাদক সমস্যাকে শুধুমাত্র একটি অপরাধ হিসেবে নয়, বরং সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র এবং অর্থনৈতিক অপরাধের সমন্বিত চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখতে হবে।
কেন তরুণরা মাদকের দিকে ঝুঁকছে?এ প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়।বন্ধুমহলের চাপ, কৌতূহল, হতাশা, বেকারত্ব,সম্পর্কের ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা—সবকিছু মিলেই একজন তরুণকে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অনেকেই প্রথমে মনে করে, “একবার চেষ্টা করলে ক্ষতি কী?” কিন্তু নেশার জগতের সবচেয়ে বড় প্রতারণা হলো—এটি শুরু করা সহজ, কিন্তু বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন।
চিকিৎসকদের মতে, মাদক মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
দীর্ঘদিন ইয়াবা বা অন্যান্য উত্তেজক মাদক গ্রহণের ফলে দেখা দিতে পারে—হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ,স্ট্রোকের ঝুঁকি,কিডনি ও লিভারের জটিলতা,স্মৃতিশক্তি হ্রাস,স্নায়বিক সমস্যা,রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া ইত্যাদি।মানসিকভাবে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। একজন আসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে বিষণ্নতা, সন্দেহপ্রবণতা, হ্যালুসিনেশন, অনিদ্রা এবং আক্রমণাত্মক আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন।
অনেক ক্ষেত্রে তিনি বাস্তবতা ও কল্পনার পার্থক্য হারিয়ে ফেলেন।
মাদকের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে পরিবারের ভেতরে।যে বাবা একদিন সন্তানের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই বাবাই নেশার ঘোরে পরিবারকে আতঙ্কের মধ্যে ফেলছেন। যে সন্তান একদিন বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল, সে-ই হয়ে উঠছে পরিবারের দুঃস্বপ্ন।সংসারের অর্থ চলে যাচ্ছে নেশার পেছনে। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে জমি, গয়না, সঞ্চয়। বাড়ছে কলহ, নির্যাতন ও বিচ্ছেদ।দেশে বিভিন্ন সময়ে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মাদকাসক্ত ব্যক্তির হাতে সন্তান, স্ত্রী কিংবা পরিবারের সদস্য নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনা শুধু অপরাধ নয়; এগুলো মানবিক মূল্যবোধের ভাঙনের নির্মম প্রতিচ্ছবি।
একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির কারণে শুধু একজন মানুষ নয়, পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
মাদকাসক্তি ও অপরাধের সম্পর্ক নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে।নেশার অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেকেই জড়িয়ে পড়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, প্রতারণা ও সহিংসতায়। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি, এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাস এবং নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডের পেছনেও মাদকের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।যখন সমাজের একটি অংশ মাদকের প্রভাবে নৈতিক বোধ হারিয়ে ফেলে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সামাজিক আস্থা, নিরাপত্তা এবং মানবিক সম্পর্ক।
মাদকের কারণে একজন কর্মক্ষম মানুষ ধীরে ধীরে উৎপাদনশীলতা হারায়।কর্মস্থলে অনুপস্থিতি বাড়ে, দক্ষতা কমে যায়, কর্মজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।অন্যদিকে চিকিৎসা, পুনর্বাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, বিচারিক কার্যক্রম এবং অপরাধ দমনে রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।অর্থনীতিবিদদের মতে, মাদকের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তার বড় অংশই সরাসরি হিসাবের বাইরে থেকে যায়। কিন্তু এর প্রভাব পড়ে জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর।
এ অবস্থায় মাদকবিরোধী অভিযান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু গ্রেপ্তার ও উদ্ধার অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।প্রয়োজন—সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি,আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক সচেতনতা কার্যক্রম,খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি,সহজলভ্য পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা,পরিবারে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক,গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে নয়, চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে এমন একজন মানুষ হিসেবেও দেখতে হবে।
এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার…মাদক একটি মানুষকে ধ্বংস করে। একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়। একটি সমাজকে দুর্বল করে। একটি জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
আজ আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত—আমরা কি শুধু দিবস পালন করব, নাকি সত্যিই মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য কাজ করব?কারণ মাদক একটি টান দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায় স্বপ্ন, সম্পর্ক, সম্মান, সম্ভাবনা এবং জীবনকে।আসুন, মাদককে না বলি। জীবনকে হ্যাঁ বলি। প্রজন্মকে বাঁচাই, পরিবারকে বাঁচাই, দেশকে বাঁচাই।
মাদকমুক্ত বাংলাদেশই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার। মাদকমুক্ত দেশ গড়তে চাই সামাজিক প্রতিরোধের জাগরণ এবং প্রতিরোধেই মুক্তির পথ॥
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.