নিজস্ব প্রতিবেদক
কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক স্ট্রোকের রোগীর পায়ে থেরাপি দেওয়ার সময় চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ উঠেছে। ফিজিওথেরাপিস্টের গাফিলতিতে রোগীর পা মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে এবং তিনি এখন স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আলমগীর হোসাইন (৬০) কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া গ্রামের বাসিন্দা। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ও নিরুপায় হয়ে গত ২১ জুন হাসপাতালের উপ-পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন রোগীর ছেলে মোহাম্মদ আজিজুল হক। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঘটনার তদন্তে ২২ জুন ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে স্ট্রোকজনিত কারণে আলমগীর হোসাইনকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমএমডব্লিউ ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, ৪ মে তাকে হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগে নেওয়া হয়।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সেখানে কর্তব্যরত ফিজিওথেরাপিস্ট কামরুজ্জামান সোহাগ রোগীর বাম পায়ে থেরাপি মেশিন সংযুক্ত করে বিদ্যুৎ চালু করেন। কিন্তু এরপর রোগীকে কোনো প্রকার পর্যবেক্ষণে না রেখে তিনি কক্ষটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। রোগী দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মাত্রার ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। মেশিনের অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত তাপের কারণে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার পা গুরুতরভাবে পুড়ে যায় এবং বড় বড় ফোসকার সৃষ্টি হয়।
রোগীর ছেলে মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, বাবার চিৎকার ও গোঙানি শুনে ছুটে এসে ফিজিওথেরাপিস্ট দ্রুত মেশিনটি খোলেন। কিন্তু ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তিনি বিষয়টিকে পাত্তাই দেননি। সামান্য মলম আর অ্যান্টিবায়োটিক দিলেই সেরে যাবে বলে আমাদের আশ্বস্ত করেন। পরদিন ৫ মে তড়িঘড়ি করে বাবাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র (রিলিজ) দিয়ে দেওয়া হয়।
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর আলমগীর হোসাইনের পায়ের অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক রূপ নেয়। পুরো পা ফুলে গিয়ে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। উপায় না দেখে ১২ মে পরিবারের সদস্যরা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের শরণাপন্ন হন। রোগীর পায়ের ক্ষত দেখে এই চিকিৎসক বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, "এই রোগীকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিল কে?"
পরবর্তীতে অবস্থা বেগতিক দেখে রোগীকে গত ১৩ মে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে দীর্ঘ ১ মাস চিকিৎসা নেন ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আলমগীর হোসাইন। বারডেমের চিকিৎসকরা তাকে ও তাঁর ছেলে মোহাম্মদ আজিজুল হককে জানিয়েছেন, "যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়া এবং ক্ষতের ওপর চরম অবহেলার কারণেই পরিস্থিতি এতটা জটিল হয়েছে।" বর্তমানে বৃদ্ধ আলমগীর হোসাইন স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা বা পঙ্গুত্বের চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীর পরিবার।
অভিযুক্ত ফিজিওথেরাপিস্ট কামরুজ্জামান সোহাগের সাথে কথা বললে তাঁর অভিযোগের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অভিযোগটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর গত ২২ জুন বিষয়টি তদন্তের জন্য ৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে উপ-পরিচালক জানান, ভুক্তভোগী রোগী চাইলে এই হাসপাতালেই পুনরায় ভর্তি হয়ে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তার চলমান চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন।
তবে সরকারি হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্তদের এমন চরম উদাসীনতায় একজন সাধারণ মানুষের জীবন এভাবে পঙ্গুত্বের মুখে পড়ায় স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। সবাই এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.