লেখকঃরেহানা ফেরদৌসী
প্রতি বছরের ১৪ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়; বরং মানবতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য প্রতীক। ২০০৪ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), International Federation of Red Cross (IFRC), International Society of Blood Transfusion (ISBT) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
এই দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনারের জন্মদিনকে স্মরণ করে। তার ABO রক্তের গ্রুপ আবিষ্কারই আধুনিক নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের ভিত্তি তৈরি করে। তাই বিশ্ব রক্তদাতা দিবস কেবল স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সম্মান জানানোর দিন নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষায় মানবিক অংশগ্রহণের এক বৈশ্বিক আহ্বান।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য—
“One Drop of Humanity. Give Blood. Save Lives.”
বাংলায় যার অর্থ—
“মানবতার এক ফোঁটা। রক্ত দিন, জীবন বাঁচান।”
এই প্রতিপাদ্যের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে সভ্যতার গভীরতম মানবিক বার্তা। কারণ পৃথিবীতে এমন কিছু জিনিস আছে, যা প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। রক্ত তার অন্যতম। একটি সুস্থ মানুষের শরীর থেকে স্বেচ্ছায় দেওয়া কয়েকশ মিলিলিটার রক্তই কখনও একটি শিশুর জীবন, কখনও একজন মায়ের নিরাপদ মাতৃত্ব, কখনও দুর্ঘটনায় আহত একজন মানুষের নতুন করে বেঁচে ওঠার শেষ আশায় পরিণত হয়।
বর্তমান বিশ্বে নিরাপদ রক্তের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১২ কোটির বেশি ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করা হয়। তবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো এখনও নিরাপদ রক্তের সংকটে ভুগছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে যেখানে অধিকাংশ রক্ত আসে নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবী দাতাদের কাছ থেকে, সেখানে দরিদ্র দেশগুলোতে এখনও আত্মীয়নির্ভর বা জরুরি ভিত্তিক রক্ত সংগ্রহই প্রধান ভরসা।
বাংলাদেশও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়।
দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ১০ থেকে ১২ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। ডেঙ্গু, থ্যালাসেমিয়া, প্রসূতি জটিলতা, সড়ক দুর্ঘটনা, ক্যান্সার চিকিৎসা ও বড় অপারেশন—সব মিলিয়ে এই চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। অথচ সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে সংগ্রহ হয় প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ ব্যাগ। ফলে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রক্তের ঘাটতি থেকেই যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে এখনও শতভাগ স্বেচ্ছা রক্তদান সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর স্বজনদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “জরুরি রক্ত প্রয়োজন” লিখে পোস্ট করতে হয়। হাসপাতালের করিডোরে রক্তের জন্য উদ্বিগ্ন স্বজনদের অপেক্ষা—এ দৃশ্য আজও বাংলাদেশের বাস্তবতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করতে হলে স্বেচ্ছায় ও নিয়মিত রক্তদাতার সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ স্বেচ্ছাসেবী দাতাদের রক্ত তুলনামূলক নিরাপদ এবং ঝুঁকিমুক্ত। WHO দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিটি দেশকে স্বেচ্ছা ও অবৈতনিক রক্তদাতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
তবে বাংলাদেশে রক্তদান নিয়ে এখনও নানা ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়, ওজন কমে যায় কিংবা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সুস্থ একজন মানুষ নিরাপদভাবে নির্দিষ্ট সময় পরপর রক্ত দিতে পারেন। শরীর অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ঘাটতি পূরণ করে ফেলে। বরং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতার কারণে রক্তদাতারা অনেক সময় নিজেদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও সতর্ক হয়ে ওঠেন।
নারীদের রক্তদান নিয়েও সমাজে অপ্রয়োজনীয় ভয় ও ভুল ধারণা রয়েছে। ফলে দেশের মোট রক্তদাতাদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ এখনও খুব কম। অথচ চিকিৎসকদের মতে, শারীরিকভাবে উপযুক্ত হলে নারীরাও নিরাপদভাবে রক্ত দিতে পারেন। জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে সচেতন রক্তদানে সম্পৃক্ত করতে পারলে বাংলাদেশের রক্ত সংকট অনেকাংশেই কমে আসতে পারে।
বাংলাদেশে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। তরুণদের অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন রক্তদাতা নেটওয়ার্ক জরুরি রক্ত সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। “বাঁধন”, “সন্ধানী”, “কোয়ান্টাম”সহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছায় রক্তদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখন রক্ত সংগ্রহের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
তবুও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও পর্যাপ্ত ব্লাড ব্যাংক নেই। অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপদ রক্ত সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা অনুপস্থিত। কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় রক্ত সংরক্ষণ ও পরিবহনে জটিলতা তৈরি হয়। আবার কোথাও কোথাও এখনও পেশাদার রক্তদাতা চক্রের অস্তিত্বের অভিযোগও রয়েছে, যা নিরাপদ রক্ত ব্যবস্থাপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে একটি ব্যাগ রক্তকে বিভিন্ন উপাদানে বিভক্ত করে একাধিক রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও অনেক ক্ষেত্রে “হোল ব্লাড” ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এই সীমাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রক্ত সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে রক্তদান বিষয়ে সচেতনতা তৈরি, জাতীয় রক্তদাতা ডাটাবেজ গঠন, নারী রক্তদাতা বাড়ানো, উপজেলা পর্যায়ে নিরাপদ ব্লাড স্টোরেজ ইউনিট স্থাপন এবং নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদান ক্যাম্প আয়োজন—এসব উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, রক্তদানকে শুধু জরুরি প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে হবে।
কারণ একটি সভ্য সমাজ কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ হয় না; মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতাও তার বড় পরিচয়। রক্তদান সেই সহমর্মিতার সবচেয়ে জীবন্ত উদাহরণগুলোর একটি।
একজন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর বেঁচে থাকা, প্রসবকালীন জটিলতায় থাকা একজন মায়ের নিরাপদে ফিরে আসা কিংবা দুর্ঘটনায় আহত একজন মানুষের নতুন জীবন পাওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোনো এক অচেনা মানুষের স্বেচ্ছায় দেওয়া রক্ত।
এই মানবিক বন্ধনই সভ্যতাকে সুন্দর করে।
তাই বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক—রক্তদানকে ভয়ের নয়, মানবতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করা নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদানে। কারণ একজন মানুষের কয়েক মিনিট সময় হয়তো অন্য একজন মানুষের পুরো জীবনের সমান মূল্য বহন করে।
মানুষ মানুষের জন্য—এই চিরন্তন সত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক হয়তো একটি স্বেচ্ছায় রক্তদান।
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.