রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং তা রাষ্ট্রের চরিত্র, নৈতিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ আজ ঠিক তেমনই এক সময় অতিক্রম করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা, ক্ষমতার পালাবদল, বিচারহীনতা এবং সামাজিক অস্থিরতার পর বর্তমান সরকার এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা।
গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য সেই বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরকার আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়, যেন তিনি বাংলাদেশের আদালতে চলমান মামলাগুলোর মুখোমুখি হন। এই বক্তব্য রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার আলোচনাতেও এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কারণ বাংলাদেশ বহু বছর ধরে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে গেছে, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিশোধপরায়ণতা, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং প্রতিহিংসামূলক প্রশাসনিক আচরণের অভিযোগ উঠেছে বারবার। অতীতের অভিজ্ঞতা জনগণকে শিখিয়েছে—ক্ষমতা বদলালেই বিচারব্যবস্থা অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ফলে বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রমাণ করা যে তারা প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নীতিতে বিশ্বাসী।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে যে আলোচনা চলছে, সেটি নিছক কোনো ব্যক্তি বা দলের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান, সাংবিধানিক কাঠামো এবং বিচারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন। সরকার যদি তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে এনে স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে পারে, তবে সেটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হবে—বাংলাদেশে আইন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কাজ করে না। তবে এ ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। কারণ রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কোনো বিচারপ্রক্রিয়া যদি নিরপেক্ষতা হারায়, তবে তা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশ্ব এখন কেবল বিচারের দাবি দেখে না; তারা বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, মানবাধিকার, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগও পর্যবেক্ষণ করে। তাই সরকারের দায়িত্ব শুধু কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা নয়; বরং এমন একটি বিচারিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, যা জনগণ এবং আন্তর্জাতিক মহল উভয়ের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত। এটি কেবল উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষের জীবন, নিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ধর্ষণ, হত্যা, সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের চলমান অভিযান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, সরকার “প্রো-অ্যাক্টিভ” ও “রি-অ্যাক্টিভ”—উভয় পদ্ধতিতে কাজ করছে।
এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দর্শন রয়েছে। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কেবল অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জনগণ বহুদিন ধরে এমন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে অপরাধের বিচার দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে গেছে, মামলার তদন্ত রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ কারণে বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন। জনগণ এখন আর কেবল আশ্বাস শুনতে চায় না; তারা দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা দেখতে চায়, অপরাধী যদি ক্ষমতাসীন দলের কেউও হন, তাহলেও আইন তাঁর বিরুদ্ধে সমানভাবে কার্যকর হয় কি না। কারণ আইনের প্রকৃত শক্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সেটি দুর্বল ও শক্তিশালী—উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তনু হত্যা মামলাসহ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা বেশ কিছু আলোচিত মামলার তদন্ত পুনরায় সক্রিয় করার কথা বলেছেন। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ বিচারহীনতা একটি রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দেয়। যখন একটি সমাজে মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে অপরাধের বিচার হবে, তখন সেখানে অপরাধের সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে। সুতরাং পুরোনো মামলাগুলোর পুনঃতদন্ত শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়; এটি জনগণের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনারও একটি প্রচেষ্টা।
তবে বাস্তবতা হলো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ চিরুনি অভিযান বা ব্লক রেইড তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা। কারণ অপরাধের পেছনে কেবল ব্যক্তি নয়, অনেক সময় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করে।
বর্তমান সরকার যে বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে, সেটি হলো আইন সংস্কারের প্রশ্নে সংযমী অবস্থান। মন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন, সাময়িক ক্ষোভ বা আবেগের বশবর্তী হয়ে চটজলদি আইন প্রণয়ন কিংবা বিশেষ আদালত গঠন করা সমীচীন নয়। এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আমাদের দেশে বহু সময় জনরোষের মুহূর্তে কঠোর আইন তৈরি হয়েছে, কিন্তু পরে সেই আইন অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল কঠোর হওয়া নয়; ন্যায়সঙ্গত হওয়া। কঠোর আইন যদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ তৈরি করে, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্যই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তাই সরকারের উচিত আইন প্রয়োগে ভারসাম্য বজায় রাখা—যেখানে অপরাধী শাস্তি পাবে, কিন্তু কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন।
আজকের বাংলাদেশ একটি জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে রয়েছে রাজনৈতিক মেরুকরণ, অন্যদিকে রয়েছে জনগণের শান্তি ও স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষা। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—রাষ্ট্রকে প্রতিশোধের সংস্কৃতি থেকে বের করে এনে ন্যায়বিচারের সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যাওয়া।
কারণ প্রতিশোধ সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারই পারে একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী করতে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই মনে রাখে, যারা ক্ষমতা ব্যবহার করেছে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য।
বাংলাদেশ আজ সেই ইতিহাস রচনার সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান সরকার যদি নিরপেক্ষ বিচার, জবাবদিহিতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে, তবে সেটি কেবল একটি সরকারের সাফল্য হবে না; সেটি হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
— রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
২৩ মে ২০২৬ ইং
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.