রেহানা ফেরদৌসী
পরন্ত বিকেলের মা-সন্তানের আলাপচারিতাঃ
বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে ঘরের জানালার কাঁচে লেগে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। উঠোনে পাতার ওপর পড়ে থাকা রোদটা একটু একটু করে ফিকে হয়ে আসছে। ঘরের ভেতর মায়ের পরিচিত ব্যস্ততা—কখনো রান্নার হাঁড়ির শব্দ, কখনো কাপড় গুছানোর নীরবতা। এমনই এক শান্ত বিকেলে সন্তানটা এসে মায়ের পাশে বসে পড়ে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে সে ধীরে ধীরে বলে ওঠে—
সন্তান:
— মা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
মা (চোখ না তুলে):
— হ্যাঁ, বল।
সন্তান:
— তুমি তো কোনো চাকরি করো না… তাই না?
মা একটু থেমে যায়। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলে—
মা:
— না, আমি বাইরে কোথাও যাই না।
সন্তান একটু ভেবে আবার বলে—
সন্তান:
— তাহলে তুমি সারাদিন কী করো, মা?
মা এবার কাজ থামিয়ে সন্তানের দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে ক্লান্তি আছে, আবার অদ্ভুত শান্তিও আছে।
মা কিছু না বলে আবার কাজ করতে থাকে। তখন সন্তান নিজেই বলতে থাকে, যেন ধীরে ধীরে নিজের উপলব্ধি খুলে যাচ্ছে—
সন্তান:
— আমি যখন সকালে ঘুম থেকে উঠি, দেখি তুমি আমার জন্য জামা গুছিয়ে রেখেছ…
আমি বুঝি না, এই কাজটা তো কেউ বলে না—তবুও তুমি করো।
একটু থেমে আবার বলে—
সন্তান:
— আমি যখন অসুস্থ হই, আমার গায়ে জ্বর ওঠে… তখন তুমি রাত জেগে আমার পাশে বসে থাকো…
ডাক্তার না হয়েও তুমি আমার প্রথম ডাক্তার হয়ে যাও।
মা নীরবে শোনে, চোখে মৃদু নরমতা।
সন্তান কথা চালিয়ে যায়—
সন্তান:
— আমি যখন পড়া বুঝি না, তুমি বইটা আমার সামনে ধরে বুঝিয়ে দাও…
শিক্ষকের মতো না, তার চেয়েও কাছের কিছু হয়ে।
সে একটু হাসে, কিন্তু চোখ ভিজে আসে—
সন্তান:
— আমি যখন ক্ষুধার্ত থাকি, তুমি নিজের ক্লান্তি ভুলে আমার জন্য খাবার বানাও…
রাঁধুনি না হয়েও তুমি আমার সবচেয়ে ভালো খাবারের ঠিকানা।
সে এবার একটু নিচু স্বরে বলে—
সন্তান:
— আমি যখন বাইরে যাই, আমার জামা-কাপড়, চুল, সব ঠিক করে দাও…
ফ্যাশন ডিজাইনার না হয়েও তুমি জানো আমাকে কীভাবে সুন্দর করে তুলতে হয়।
একটা দীর্ঘ নীরবতা নামে ঘরে। শুধু বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
সন্তান ধীরে বলে—
সন্তান:
— মা, আমি তো কখনো তোমাকে এসব নাম দিই না… কিন্তু তুমি তো আমার জীবনের সব নামের ভেতরে আছো।
সে মায়ের পাশে আরও একটু ঘেঁষে বসে—
সন্তান:
— তুমি কোনো অফিসে যাও না, কোনো বেতন পাও না…
তবুও আমার পুরো পৃথিবীটা তোমার হাতেই গড়া।
মা এবার সন্তানের মাথায় হাত রাখে। সেই স্পর্শে কোনো শব্দ নেই, শুধু বোঝাপড়া আছে।
সন্তান ধীরে ধীরে বলে—
সন্তান:
— আমি আগে বুঝতাম না, মা…
তুমি শুধু ঘরে থাকো বলে তুমি ছোট কিছু।
কিন্তু এখন বুঝি—তুমি ঘরের ভেতরের নীরব আলো, যেটা না থাকলে সব অন্ধকার হয়ে যায়।
ঘরের ভেতর তখন সন্ধ্যার ছায়া নামছে। কিন্তু সেই ছায়ার মাঝেও এক উষ্ণতা টিকে আছে—মায়ের উপস্থিতির মতো।
মা কিছু বলে না। শুধু সন্তানের কপালে হাত রাখে।
আর সেই নীরবতাই যেন সবচেয়ে গভীর উত্তর।
শেষ কথা
মা কোনো একক পরিচয় নয়। সন্তানের দৃষ্টিতে তিনি একাই হয়ে ওঠেন ঘরের সব পরিচয়—যেখানে ভালোবাসা নাম নেয় না, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে উপস্থিত থাকে।
কারণ—নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নামই “মা”।
মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট দিন বা মা দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। এটি হওয়া উচিত জীবনের প্রতিদিনের এক নীরব চর্চা—একটি চলমান অনুভব, যা সময়ের সাথে ফুরিয়ে যায় না, বরং গভীর হয়। কারণ মা কেবল একজন অভিভাবক নন, তিনি সন্তানের জীবনের সেই অপরিহার্য স্তম্ভ, যার ছায়া ছাড়া কোনো পথই সম্পূর্ণ হয় না।
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.