নারী নেতৃত্বের বিকাশে সংসদ হোক গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখন আর কেবল প্রতীকী কোনো বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতি নির্ধারণ এবং গণতন্ত্রের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সেই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (১৮ মে) সোমবার বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রীপরিষদ বিভাগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে
দলের নবনির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যদের জাতীয় সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য প্রস্তুত হওয়ার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের স্থান নয়; এটি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, অধিকার, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনার প্রতিফলনের কেন্দ্রবিন্দু। একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্ব কেবল দলীয় অবস্থান তুলে ধরা নয়, বরং জনগণের পক্ষে তথ্যভিত্তিক, যুক্তিসম্মত এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। প্রধানমন্ত্রী নারী এমপিদের তথ্যসমৃদ্ধ হওয়ার, সংসদীয় কার্যপ্রণালি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখার এবং দায়িত্বশীল বক্তব্য দেওয়ার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা সংসদীয় রাজনীতিকে আরও পরিণত ও কার্যকর করার দিকেই ইঙ্গিত করে।
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নারীর অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বদলেছে। আজকের নারী শিক্ষিত, সচেতন, নেতৃত্বদানে সক্ষম এবং সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। ফলে জাতীয় সংসদে তাঁদের উপস্থিতি কেবল সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং নীতি প্রণয়ন, গণমানুষের সমস্যা উত্থাপন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তাঁদের দৃশ্যমান ও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী যে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন—ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা রোধ—তা বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এখানে ধর্ম মানুষের আত্মিক শক্তির উৎস, বিভেদের অস্ত্র নয়। সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব হবে ধর্মীয় মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে সমাজে সহনশীলতা, সম্প্রীতি এবং মানবিক চেতনা জাগ্রত রাখা। কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক বিভাজনের সুযোগ নিয়ে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সবসময় সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করে। এই জায়গায় নারী নেতৃত্ব অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী আরও যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, সেটি হলো জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি। বাস্তবতা হলো, একজন জনপ্রতিনিধির প্রকৃত শক্তি আসে জনগণের কাছ থেকে। নির্বাচনের পর জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই নারী সংসদ সদস্যদের তৃণমূলের মানুষের সুখ-দুঃখ, সমস্যা-সম্ভাবনা এবং প্রত্যাশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে হবে। তাঁদেরকে শুধু সংসদের ভেতরে নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—প্রশিক্ষণ। প্রধানমন্ত্রী সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিষয়ে নারী এমপিদের প্রশিক্ষণের যে উদ্যোগের কথা বলেছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সংসদ সদস্যদের জন্য নিয়মিত ও পেশাগত প্রশিক্ষণ একটি স্বাভাবিক বিষয়। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল; অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, সাইবার নিরাপত্তা—সব বিষয়ে একজন আইনপ্রণেতার ন্যূনতম ধারণা থাকা জরুরি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারী সংসদ সদস্যরা আরও আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ এবং কার্যকর হয়ে উঠবেন বলেই প্রত্যাশা করা যায়।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে বিএনপির ৩৬টি আসন লাভ নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই প্রতিনিধিত্ব যদি কেবল আনুগত্যের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সৃজনশীল ও জনকল্যাণমূলক রাজনৈতিক চর্চায় রূপ নেয়, তবে তা দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। নারী এমপিরা যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, সামাজিক বৈষম্য ও তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও উচ্চকণ্ঠ হন, তাহলে সংসদ প্রকৃত অর্থেই জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচননির্ভর কোনো কাঠামো নয়; এটি একটি চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর সেই সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজন যোগ্য, দায়িত্বশীল ও মানবিক নেতৃত্ব। নারী সংসদ সদস্যদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা তাই কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি ভবিষ্যতের একটি দিকনির্দেশনা।
বাংলাদেশ আজ এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এই সময়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ এবং তাঁদের কার্যকর সংসদীয় অংশগ্রহণ দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করবে—এটাই জাতির প্রত্যাশা।
--- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
১৮ মে ২০২৬ ইং
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.