বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও মানবিক উন্নয়নের প্রশ্নটি বহুদিন ধরেই আলোচনায় থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ছিল স্পষ্ট। সেই জায়গা থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ‘শিশু স্বর্গ’ প্রকল্প নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন, মানসিক বিকাশ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে সরকারের এই উদ্যোগ কেবল একটি প্রকল্প নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধিতা এখনো অনেকাংশে করুণা কিংবা দয়ার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। অথচ আধুনিক বিশ্বে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নকে মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুও এই রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক। তারও স্বপ্ন আছে, প্রতিভা আছে, সমাজকে দেওয়ার মতো সক্ষমতা আছে। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ, প্রশিক্ষণ ও সুযোগের অভাবে তারা পিছিয়ে পড়ে। ফলে তাদের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের অবহেলাই বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
এই বাস্তবতায় ‘শিশু স্বর্গ’ প্রকল্পের ধারণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলায় পাইলট ভিত্তিতে এই কার্যক্রম চালু করার সিদ্ধান্ত সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। কারণ, কোনো সামাজিক প্রকল্পকে সফল করতে হলে প্রথমে মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা যাচাই প্রয়োজন। যদি এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এটি জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করে হাজারো পরিবারের আশার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রী গত ১৩ মে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তাঁর বক্তব্যেয় যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন, সেটি হলো—প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহানুভূতি নয়, বাস্তবভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল। কারণ সহানুভূতি মানুষকে সাময়িক সান্ত্বনা দিতে পারে, কিন্তু অধিকারভিত্তিক ব্যবস্থা মানুষকে মর্যাদা দেয়। রাষ্ট্র তখনই কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত হয়, যখন দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীও সমান সুযোগ পায়।
বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যাপকভাবে হলেও প্রতিবন্ধীবান্ধব স্থাপনা নির্মাণে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ সরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা গণপরিবহনে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। অনেক ভবনে প্রবেশের র্যাম্প নেই, টয়লেট ব্যবহার উপযোগী নয়, এমনকি দরজার কাঠামোও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের অনুপযোগী। ফলে তারা প্রতিনিয়ত সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সব সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করার নির্দেশ নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো নারীদের জন্য পরিকল্পিত ইলেকট্রিক বাস সার্ভিসে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য পৃথক সুবিধা নিশ্চিত করার চিন্তা। উন্নত বিশ্বে গণপরিবহনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার ওপর দীর্ঘদিন ধরেই জোর দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও যদি গণপরিবহন ব্যবস্থায় এই সংস্কৃতি চালু হয়, তাহলে তা সামাজিক সভ্যতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করবে।
শুধু অবকাঠামো নয়, মানসিক বিকাশ ও সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও সরকারের দৃষ্টি দেওয়া প্রশংসনীয়। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ প্রতিযোগিতায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড একজন শিশুর মানসিক বিকাশে অসাধারণ প্রভাব ফেলে। এই শিশুদের আলাদা করে না দেখে মূলধারার অংশ হিসেবে গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আধুনিক রাষ্ট্রনীতির অন্যতম লক্ষ্য।
তবে বাস্তবতা হলো, শুধু ঘোষণা বা নির্দেশনা দিলেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা। অতীতে বহু মানবিক উদ্যোগ পরিকল্পনার অভাব, দুর্নীতি কিংবা তদারকির দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। তাই ‘শিশু স্বর্গ’ প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনসচেতনতা। আমাদের সমাজে এখনো প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কুসংস্কার ও নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জার ভয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানকে আড়ালে রাখে। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে কোনো প্রকল্পই পুরোপুরি সফল হবে না। তাই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান তৈরির যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ধারিত হয় সে রাষ্ট্র তার দুর্বল ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিকদের কতটা মর্যাদা ও নিরাপত্তা দিতে পারে তার ওপর। ‘শিশু স্বর্গ’ প্রকল্প সেই মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সামাজিক সহযোগিতার সমন্বয়। তাহলেই হয়তো একদিন এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, যেখানে কোনো শিশুকে তার শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে থাকতে হবে না; বরং প্রত্যেকেই সমান মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে।
---রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
১৬ মে ২০২৬ ইং
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.