সুলাইমান আহমদ,
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার দানাপাটুলি ইউনিয়নের পশ্চিম মাথিয়া এলাকার একসময়ের নির্জন জঙ্গল আজ কোরআনের তিলাওয়াতে মুখর। যেখানে একসময় ছিল গর্ত, ঝোপঝাড় আর নীরবতা, সেখানে আজ দাঁড়িয়ে আছে দুইতলা মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা।
এই প্রতিষ্ঠানের পেছনে রয়েছে সংগ্রাম, ধৈর্য, উপহাস সহ্য করা এবং আল্লাহর উপর অটল ভরসার এক বাস্তব কাহিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই দশক আগে এলাকার দ্বীনপ্রেমী আলেম মাওলানা আব্দুল হক (দা.বা.) ইখলাসভিত্তিক একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু তখন তার নিজের কোনো জমি বা সম্পদ ছিল না।
মানুষের কাছে বহুবার জমি চেয়েও তিনি পাননি।
অবশেষে ২০০৪ সালে নিজের মায়ের কাছ থেকে মাত্র দুই শতাংশ জমি মাদ্রাসার নামে দলিল করেন। পরে ধীরে ধীরে চাচি, ফুফু ও আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে আরও জমি সংগ্রহ করা হয়। সব মিলিয়ে মোট সাত শতাংশ জমির উপর শুরু হয় মাদ্রাসার যাত্রা।
তবে জমি পাওয়ার পরও সামনে আসে বড় সমস্যা। জমির নিচে ছিল বড় গর্ত। মাটি ভরাট করার মতো অর্থ ছিল না।
তখন বাঁশ দিয়ে উপরে ছাদের মতো একটি মাচা তৈরি করা হয়। চারদিকে গাছের পাতা ও ঝোপের পাতা দিয়ে বেড়া তৈরি করা হয়। সেই সামান্য আশ্রয়ের নিচেই শুরু হয় আল্লাহর নামের জিকির।
স্থানীয়রা জানান, সেই সময় অনেকেই তাকে উপহাস করত। কেউ বলত, “পাগলের পাগলামি শুরু হয়েছে।”
কিন্তু মাওলানা আব্দুল হক থেমে থাকেননি।
প্রতিদিন সেখানে উচ্চারিত হতো
আল্লাহু হাজিরি
আল্লাহু নাজিরি
আল্লাহু শাহিদি
আল্লাহু মায়ি
নিচে বসে জিকির, আর উপরে থেকে পড়ত বৃষ্টির পানি।
এভাবেই দিন যায়, মাস যায়।
প্রায় তিন বছরের মাথায় ধৈর্য, জিকির ও দোয়ার ফলাফল ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
মানুষ এগিয়ে আসে। কেউ শ্রম দিয়ে, কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করে।
সেই ছোট্ট বাঁশের ঘরের জায়গায় নির্মিত হয় একটি মসজিদ, যা পরে দুইতলা মসজিদে পরিণত হয়।
বর্তমানে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাদ্রাসায়ে ইদ্রিসিয়া।
প্রতিষ্ঠানটিতে নূরানী শাখা, হিফজ শাখা, জামাত শাখা এবং একটি মহিলা শাখা চালু রয়েছে। প্রতিদিন এখানে শিক্ষার্থীরা কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা গ্রহণ করছে।
এলাকাবাসীর ভাষায়, যে জায়গাটিকে একসময় জঙ্গল বলা হতো, আজ সেই জায়গাই কোরআনের নূরে আলোকিত।
স্থানীয়রা মনে করেন, এটি শুধু একটি মাদ্রাসার গল্প নয়; বরং ধৈর্য, বিশ্বাস এবং আল্লাহর উপর নির্ভরতার এক জীবন্ত উদাহরণ।