হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় মানবাধিকার সংস্থা ও এনজিওর সাইনবোর্ড ব্যবহার করে তরুণীদের জিম্মি করে ধর্ষণ, আপত্তিকর ভিডিও ধারণ এবং বিদেশে ভিডিও পাচারের এক রোমহর্ষক চিত্র বেরিয়ে এসেছে। ‘দরিদ্র কল্যাণ সংস্থা’ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা’ নামের দুটি ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এই অনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন কথিত মানবাধিকার কর্মী নুরুল ইসলাম ওরফে নুরুল হক। এই ঘটনায় অতিষ্ঠ ও সর্বস্ব হারানো ৪ তরুণী বাদী হয়ে বাহুবল মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় মূল অভিযুক্ত নুরুল হকসহ তার সহযোগী ওসমানীনগরের আবুল বশর (মামুন বখত) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। ২০১২ সালের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলাটি রুজু করা হয়।
চাকরির প্রলোভনে শুরু, তারপর দুঃস্বপ্ন : মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, চুনারুঘাট উপজেলার এক তরুণী বছরখানেক আগে নুরুল হকের সংস্থায় অফিস সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই নুরুল হক তাকে বিভিন্নভাবে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে কার্যালয়ের ভেতরেই তাকে প্রথমবার জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ধর্ষণের সময় নুরুল হক কৌশলে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে রাখেন। পরবর্তীতে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টানা পাঁচ মাস তাকে জিম্মি করে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়।
লোমহর্ষক অভিযোগে ওই তরুণী জানান, তাকে অচেতন নাশক ওষুধ খাইয়ে নুরুল হকের বন্ধু ও প্রবাসীদের হাতেও তুলে দেওয়া হতো। সম্প্রতি তিনি চাকরি ছেড়ে দিলে সেই আপত্তিকর ভিডিওগুলো বিদেশে থাকা বন্ধুদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
আরও অনেক শিকার, একই কায়দায় ব্ল্যাকমেইল:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু একজন নয়, ওই প্রতিষ্ঠানের আরও একাধিক নারী কর্মী একই লালসার শিকার হয়েছেন। চুনারুঘাট ও বাহুবলের আরও দুই তরুণী (১৮) একইভাবে ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রভাবশালী চক্রের ভয় এবং সামাজিক লোকলজ্জার কারণে এতদিন তারা মুখ খোলার সাহস পাননি। এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাশিদা নামে এক শিক্ষার্থী হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, নুরুল হক অসহায় নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের পাশাপাশি তাদের গোপন ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করছেন।
বহুরূপী নুরুল হকের জালিয়াতি: নুরুল ইসলাম ওরফে নুরুল হক নিজেকে কখনো এনজিও কর্মকর্তা, কখনো মানবাধিকার নেতা, আবার কখনো গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। ২০১৪ সালে হবিগঞ্জ সদরের বাতাশর এলাকায় বিলাসবহুল অফিস নিয়ে তিনি তার এই ‘প্রতারণার রাজ্য’ শুরু করেছিলেন । অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকে ‘মানবাধিকার কার্ড’ বিলি করে তাদের ছত্রচ্ছায়ায় তিনি এসব অপকর্ম চালিয়ে যেতেন।
তার আয়ের অন্যতম উৎস ছিল সাধারণ মানুষের চুরি হওয়া মোবাইল উদ্ধার বা কল লিস্ট বের করে দেওয়ার নাম করে অবৈধ তথ্য সংগ্রহ এবং মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া। এছাড়া অসহায় মানুষের ছবি তুলে লন্ডন-আমেরিকায় পাঠিয়ে সাহায্যের নামে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করতেন বলে জানা গেছে।
ভিডিও ভাইরাল ও জনরোষ: সম্প্রতি একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দেখা যায়- ১৬ বছরের এক কিশোরীকে লন্ডনে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে নুরুল হক যৌন হয়রানি করছেন। ভিডিওতে তাকে ইমোর মাধ্যমে জনৈক এক প্রবাসীর সাথে ওই কিশোরীকে ‘ফোন সেক্স’ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। কিশোরী রাজি না হওয়ায় তাকে নানাভাবে প্রলুব্ধ ও ভয়ভীতি দেখানো হয়।
অবশেষে বাহুবল মডেল থানায় ভুক্তভোগী ৪ তরুণী
মামলা দায়েরের করলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে মামলা তুলে নিতে বিবাদী পক্ষ থেকে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা এই ‘ছদ্মবেশী নুরুল হকসহ অপরাধী চক্রের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
বাহুবল মডেল থানার ওসি মো: সাইফুল ইসলাম জানান, মামলা রুজু হয়েছে এবং মামলার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। আসামিরা বর্তমানে পলাতক থাকলেও তাদের গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.