রেহানা ফেরদৌসী
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি তৃতীয় রমজান। বিধ্বস্ত গাজা শহরের ধ্বংসস্তূপ আর ভেঙে পড়া ভবনের মাঝেও রাস্তায় টাঙানো ছোট ফানুস ও রঙিন বাতির মালা, যা তাদের ক্লান্ত মনে একটুখানি স্বস্তি ও আশার আলো জ্বালিয়েছে। শিবিরের জরাজীর্ণ তাঁবুর ভেতর দেয়ালে ঝুলছে শিশুদের আঁকা কিছু ছবি। ইসলাম ধর্মের পবিত্রতম মাসকে স্বাগত জানাতে সীমিত সামর্থ্যেও ফিলিস্তিনিরা চেষ্টা করছে উৎসবের আবহ ফিরিয়ে আনতে। সীমিত সামর্থ্যে শিশুদের মুখে হাসিটাই বড় কথা। গত দুই বছরের শোক আর বিষণ্নতা থেকে একটু মুক্তি পেতেই এই আয়োজন।গাজায় অন্যবারের তুলনায় এবারের রমজান মাসের বৈশিষ্ট্য হল, এবার পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত।যদিও এই শান্তি মোটেও নিষ্কণ্টক নয়।এখনও কয়েক দিন আগের ইসরায়েলি ড্রোনের গুলির চিহ্ন স্পষ্ট। তবে যুদ্ধের চরম পর্যায়ের তুলনায় তীব্রতা এখন কিছুটা কম।ঐতিহাসিক ওমারি মসজিদে কয়েক ডজন মুসল্লি প্রথম রমজানের ফজরের নামাজ আদায় করেন।শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে ভারী জ্যাকেট গায়ে দিয়েই তারা নামাজে শরিক হন।দখলদারিত্ব, মসজিদ-স্কুল ধ্বংস আর ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরেও আল্লাহর ইবাদতের জন্য তারা সমবেত হন। গত দুই বছরে ইসরায়েলি হামলায় উপত্যকাটিতে ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। একটি নড়বড়ে ‘যুদ্ধবিরতির’ মধ্যে এবারের রমজান শুরু হয়েছে।তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত নয়। মাঝেমধ্যে গোলা বর্ষণ হচ্ছে। পবিত্র রমজানের প্রথম দিন গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে এক ফিলিস্তিনি যুবক নিহত হয়েছেন ।ভোর থেকেই পূর্ব খান ইউনিস এলাকায় ইসরাইলি সামরিক যান থেকে ভারী গুলিবর্ষণ করা হয়। একই সঙ্গে দক্ষিণ গাজার রাফাহর উত্তরে একটি এলাকায়ও গুলি চালানো হয়। এ ছাড়া মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বাংশে গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।এছাড়াও গাজা শহর ও উত্তরাঞ্চলেও ইসরাইলি যানবাহন থেকে পূর্ব বেইত লাহিয়ার দিকে গুলি ছোড়া হয়। দক্ষিণ-পূর্ব গাজা সিটির জেইতুন এলাকার আল সিক্কা সড়কের আশপাশেও কামান থেকে গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে আর কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।এ পরিস্থিতিতে তাঁবুর চারপাশের প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সঙ্গে দুঃখ ভাগাভাগি করেই তারা বেঁচে আছেন।গাজাবাসীর মনে গত রমজানের দুঃসহ স্মৃতি আজও টাটকা। গত বছরের ১৯ মার্চ, অর্থাৎ রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সব সীমান্ত পথ। ফলে দেখা দিয়েছিল চরম মানবিক বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষ আর যুদ্ধের সংমিশ্রণ।গত অক্টোবরে গাজায় নতুন করে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। যুদ্ধবিরতি এখনো বজায় থাকলেও তা বেশ ভঙ্গুর। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় হতাহতের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।বাজারে কিছু খাবার পাওয়া গেলেও দাম আকাশচুম্বী। অধিকাংশ মানুষের হাতে অর্থ নেই। ফলে তাঁরা ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল।ত্রাণ হাতে পাওয়ার পর এ খুশির আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ক্ষত।গ্যাসের সিলিন্ডার তাদের কাছে ‘গুপ্তধন’।গাজায় রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট। দুই বছর ধরে খোলা আকাশের নিচে লাকড়ির আগুনে রান্না করছেন তারা ।অনেক কষ্টে জমানো কিছু টাকা দিয়ে রমজানের প্রথম দিন ইফতার কিনেছেন তারা।গাজাবাসীর কাছে এবারের রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়, বরং টিকে থাকার এক কঠিন পরীক্ষা। গাজার দক্ষিণাঞ্চলে আল-মাওয়াসি এলাকায় হাজার হাজার মানুষ এখনো ত্রিপল ও অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন।যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পুনর্গঠনের কাজ শুরু হতে সময় লাগছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সহায়তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সীমিত পণ্য প্রবেশ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে অধিকাংশ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।বাজারদর না কমায় জীবনযাত্রা এখনও অনিশ্চিত।
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও রমজান গাজাবাসীর জন্য হয়ে উঠেছে আশা, সংহতি ও অটুট বিশ্বাসের প্রতীক। গাজার প্রতিটি তাঁবুতে এখন একটাই প্রার্থনা, এই রমজান যেন সবার জন্য কল্যাণকর আর শান্তির হয়…সবাই যেন নিজ গৃহে ফিরতে পারেন,যেন শান্তি নিয়ে আসে, যেন আবার সেই দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধের কবলে পড়তে না হয়।বিশ্বে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও সহমর্মিতার সুর বয়ে যাক এবং পৃথিবীতে শান্তি বর্ষিত হোক।ফিলিস্তিনিদের চোখের জল মুছে যাক, আর প্রতিটি হৃদয়ে আল্লাহর রহমতের আলো জ্বলে উঠুক। আমরা প্রার্থনা করি, তাদের কষ্টের দিন শেষ হোক, আর ভালোবাসা ও ন্যায়ের নতুন ভোর আসুক।
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.