ওয়াসিম কামাল
লিবিয়ায় অবস্থানরত অভিবাসী, শরণার্থী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর চরম অমানবিক ও পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির এক নতুন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশটিতে অভিবাসীরা নিয়মিতভাবে হত্যা, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং মানবপাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধের শিকার হচ্ছেন।
গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয় এবং লিবিয়ায় জাতিসংঘের সহায়তা মিশন (UNSMIL) যৌথভাবে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, লিবীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ থাকা অপরাধী চক্র ও পাচারকারী নেটওয়ার্কগুলো অভিবাসীদের অপহরণ করে আটকে রাখছে এবং তাদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাচ্ছে।
ভয়াবহ নির্যাতন ও দাসত্ব: প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে (আটক কেন্দ্র) অভিবাসীদের দাস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন দাসত্ব এবং মুক্তিপণের জন্য জিম্মি করার মতো ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীদের পরিচয়পত্র ও ব্যক্তিগত সম্পদ কেড়ে নিয়ে সেগুলো পুনরায় বিক্রি করে দিচ্ছে পাচারকারীরা।
নারীদের ওপর সহিংসতা: প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া অভিবাসী নারীরা তাদের ওপর হওয়া লোমহর্ষক যৌন নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। তবরুক অঞ্চলের একটি গোপন পাচারকেন্দ্রে আটকে রাখা এক ইরিত্রিয় নারী জানান, তাকে বারবার দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। অন্য এক নারী জানান, তার চোখের সামনেই তার সঙ্গীকে পিটিয়ে এবং রক্তক্ষরণের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে।
সমুদ্রে বাধা প্রদান: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিবিয়ার কোস্টগার্ড বা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সমুদ্রে অভিবাসীদের নৌকা মাঝপথে আটকে দিচ্ছে এবং জোরপূর্বক লিবিয়ায় ফিরিয়ে আনছে। এর ফলে অভিবাসীরা পুনরায় একই চক্রাকার নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
জাতিসংঘের আহ্বান:
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার তুর্ক (Volker Türk) এই পরিস্থিতিকে ‘একটি অন্তহীন দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও পাচারকারীদের লোভে অভিবাসীদের জীবন আজ বিপন্ন। এই শোষণমূলক বাণিজ্যিক মডেল বন্ধ হওয়া জরুরি।”
জাতিসংঘ লিবিয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন:
১. অন্যায়ভাবে আটকে রাখা সকল অভিবাসীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হয়।
২. অনিয়মিত প্রবেশ বা অবস্থানের কারণে অভিবাসীদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করা বন্ধ করা হয়।
৩. মানবপাচার ও দাসত্বের সাথে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়।
একই সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে লিবিয়ার কোস্টগার্ডের কার্যক্রমে অর্থায়ন বা সহযোগিতা করার আগে মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি কঠোরভাবে নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।