লেখাঃ রেহানা ফেরদৌসী
ভোট প্রদানে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী, যার অর্থ তাদের ভোটের গুরুত্ব অনেক। নারীরা শিক্ষা, আইন, প্রশাসন ও নাগরিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
ভোট প্রদানে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা জনসংখ্যার অর্ধেক অংশীদার এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অপরিহার্য। নারীর ভোট আইন প্রণয়ন, পারিবারিক ও সামাজিক উন্নয়ন, এবং নারীবান্ধব নীতি নির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলে।তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ লিঙ্গবৈষম্য দূর করে এবং সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ভোটার হিসেবে পিছিয়ে আছে নারী ভোটাররা।নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তালিকানুসারে বর্তমানে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৬৩ লাখ ৭ হাজার ৫০৪ জন। এর মধ্যে নারী ৬ কোটি ২২ লাখ ৫ হাজার ৮১৯ জন আর পুরুষ ৬ কোটি ৪১ লাখ ৪৫৫ জন।অর্থাৎ নারী ভোটারের চেয়ে পুরুষ ভোটার সংখ্যা বেশি , মাত্র ১৯ লাখ ৪ হাজার ৬৩৬ জন।নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সর্বস্তরের জনগণকে ভোটার হতে উৎসাহিত করতে ব্যপক প্রচারণাও চালানো হয়েছে। অন্যদিকে নারী নেতৃবৃন্দরা মনে করেন, নারীরা ভোটার হলে রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণে আগ্রহ বাড়বে।তবে ভোটার বাড়লেই ক্ষমতায়ন বাড়বে এই কথা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা সময়ই বলে দিবে।সারাদেশে সর্বত্র নির্বাচনী প্রচারণায় সর্বস্তরেই পুরুষ ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার দৌড়ঝাঁপরত নেতারা, জনসভা, পথসভা, মিছিল, মিটিং ও কর্মীদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালাতে দল বদ্ধ ভাবে দাওয়াত এ অংশগ্রহণ ইত্যাদি চলছে।দলের নেতাদের সালাম দেওয়া ও শুভেচ্ছায় ছবি সম্বলিত পোস্টারে, ব্যানারে ছেয়ে গেছে পথ ঘাট, ওলি, গলি, সমগ্র দেশের আনাচে কানাচের দেওয়াল ও পিলার এমন কি গাছ গাছালী পর্যন্ত। সেখানে নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য তেমন কোনো নজর কারা উদ্যোগ খুব একটা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী এখনো অনেক পেছনে। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে পরিলক্ষিত হয়েছে একজন প্রধানমন্ত্রী একজন বিরোধী দলের নেতৃত্ব দিয়ে নারীর সামগ্রিক রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হয়েছে তা বলা যায় না। কারণ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী দলে প্রতি কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩৩ শতাংশের এখনো পূরণে তেমন কোনো অগ্রগতি চক্ষুগোচর হয়নি।
৭১ সাল থেকে সংরক্ষিত আসনে নারীর সংখ্যা বেড়েছে তুলনামূলকভাবে তা অনেক কম। নারীকে মনোনয়ন দিতে নারীর ভোটার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন নারী নেতৃবৃন্দ।নারীরা ভোটার হলে এবং ভোট দিলে রাজনীতিতে অংশগ্রহণে আগ্রহ বাড়বে।সাধারণ আসনে নারীকে মনোনয়ন দিতে চায়না পুরুষতন্ত্র। সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন হয় না। তাই ভোটারদের সংখ্যা বাড়ালেও পুরো রাজনৈতিক কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে।প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করা নারীদের নিবন্ধনজনিত কার্যক্রমের জন্য পুরুষের ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে সমাজ।ফলে তারা নিজেরা নিবন্ধন করে ভোটার হতে পারে না। আবার এক-দুই দিনে ছুটি নিয়ে বেতন কেটে গ্রামের বাড়ি গিয়ে ভোটার হওয়া তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। ফলে এই শ্রেণির অর্থাৎ গার্মেন্টস শ্রমিক নারীরা ভোটার হন কম।নির্বাচনে ভোটার করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। ভোটার হতে উৎসাহিত করতে প্রচারণাও চালিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বস্তি এলাকাসহ ভাসমান ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করতে বেদে, যাযাবর গোষ্ঠীকেও ভোটার করার কার্যক্রমও নির্বাচন কমিশনের আছে। তবে কাউকে জোর করে নির্বাচন কমিশন ভোটার বানাতে পারে না।বাংলাদেশের নারীরা ১৯৪৬ সালে সীমিত ভোটাধিকার লাভ করে, কিন্তু ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তারা প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন যদিও অবিভক্ত বাংলায় ১৯২১ সাল থেকে সীমিত ভোটাধিকার ছিল, পাকিস্তান সৃষ্টির পর এবং পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভোটাধিকারের সুযোগ আসে।
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৪৬ সালে নির্বাচিত এবং মনোনীত উভয় ধরনের সদস্য নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ গঠিত হয়। কিন্তু সেখানে নারীদের মনোনয়নের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান ছিল না। বস্তুত ১৯৫৬ সালে প্রথম বারের মতো নারীরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটাধিকার লাভ করে। তখন প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।স্বাধীনতার পরই এদেশের ইতিহাসে প্রথম স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন স্তরে নারীরা প্রতিনিধিত্ব করার মর্যাদা লাভ করে।
এদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল তাদের বিগত নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণে প্রয়োজনীয় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছে।বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মূলধারায় নারী সমাজকে যুক্ত করার গতি ধীর, জটিল এবং প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ। ক্ল্যাসিক্যাল গণতন্ত্র, সামাজিকভাবে পিতৃতান্ত্রিকতার প্রভাব ও সহজে অপরিবর্তনীয় রাষ্ট্রীয় বিধান রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে কঠিন করে তুলেছে।এমতাবস্থায় সকলের উচিত আসন্ন নির্বাচনে নারী ভোটারদের নিরাপদে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
নারীর ভোটের গুরুত্ব:
•নারীরা জনসংখ্যার অর্ধেক, তাই তাদের ভোটের গুরুত্ব অনেক।
•নারীরা শিক্ষিত এবং সচেতন, যা তাদের ভোটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
•নারীরা রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
•নারীরা এমন আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখে যা নারী ও শিশুসহ পরিবারের সবার জন্য সুবিধাজনক।
•পুরুষের সমান ভোটদানের অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
•রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে, যা নারীর ক্ষমতায়নকে বৃদ্ধি করে।
•কর্মক্ষেত্রে নারী অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ জরুরি।
সমস্যা কোথায়?
•রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত।
•নারী প্রার্থীদের জন্য নিরাপত্তা ও সমর্থনের অভাব।
•পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
কি করা উচিত?
•রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী প্রার্থীদের জন্য সমর্থন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
•নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য প্রেরণা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত।
•সমাজে নারীর প্রতি সম্মান ও সমর্থন বৃদ্ধি করতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, নারী ভোটাররা কেবল ভোটই দেয় না, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং সুশাসনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবেও কাজ করে।তাই আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ শতভাগ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.