সাজেদুল শান্ত, তাড়াইল, কিশোরগঞ্জ।
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি বরাবরই বৈচিত্র্যময় ও নয়নাভিরাম। নদী-বিল-হাওর আর পদ্মা-মেঘনার মাটি যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক জীবন্ত ছবি। এই ছবিরই এক নিখুঁত টুকরো লুকিয়ে রয়েছে কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার একটি অখ্যাত গ্রামের কোণে- দড়িজাহাঙ্গীরপুর।
এই গ্রামের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত একটি বিস্তীর্ণ জলাভূমি, যা স্থানীয়ভাবে পরিচিত পদ্মবিল নামে। নামেই যার পরিচয়-এটি শুধুই একটি বিল নয়; বরং বর্ষার মৌসুমে রূপ নেয় এক ফুলেল রাজ্যে। বর্ষা শুরু হলেই এই বিলজুড়ে প্রস্ফুটিত হয় শত শত গোলাপি পদ্মফুল। দিগন্তছোঁয়া জলরাশির ওপর ভেসে থাকা পদ্মের পাপড়িগুলো যেন প্রকৃতির সবচেয়ে কোমল কবিতা।
প্রতিদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় এই রূপের প্রদর্শনী। পদ্মফুলের পাপড়ি ধীরে ধীরে মেলে ধরে আলোর অভ্যর্থনায়। দুপুর গড়ালে ক্লান্ত ফুলগুলো আবার গুটিয়ে নেয় নিজেদের সৌন্দর্য। এ এক অনন্য দৃশ্যপট, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
বিলটি প্রায় ২০–৩০ বিঘা এলাকায় বিস্তৃত। এতে কোনো মানুষের হাতের ছোঁয়া নেই; নেই পরিকল্পিত ফুল চাষের আয়োজন। এখানে পদ্ম জন্মায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে। এলাকার প্রবীণরা বলেন, "যতদূর মনে পড়ে, এই বিলে এমনই ফুল ফুটে এসেছে। আমরা ছোটবেলায় মাছ ধরতে যেতাম, এখন দেখি শহরের মানুষ ছবি তুলতে আসে।”
পদ্মবিল ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে একটি ক্ষুদ্র জীববৈচিত্র্য। পানির নিচে দেশীয় প্রজাতির মাছ, পদ্মপাতার ওপর নানা পাখির বিচরণ, আর বিলের চারদিকে প্রাকৃতিক গাছপালা একে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ধলাবক, পানকৌড়ি, শালিক, বাটের মতো পাখি এসে বসে পদ্মপাতায়। এ যেন এক সরল অথচ অভিজাত ইকোসিস্টেম।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এত অপার সৌন্দর্যের অধিকারী এই পদ্মবিল আজও পর্যটন মানচিত্রে জায়গা পায়নি। নেই কোনো সরকারি সংরক্ষণ উদ্যোগ, নেই ভ্রমণপিপাসুদের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও। বর্ষাকালে যাতায়াত হয় মূলত স্থানীয় নৌকায়, সেটিও সীমিত পরিসরে। কিছু সচেতন তরুণ মিলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নৌকা চালিয়ে থাকেন। দর্শনার্থীদের বেশিরভাগই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আসেন।
এই বিল ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনাও অমূল্য। সঠিক পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে দড়িজাহাঙ্গীরপুরের পদ্মবিল হয়ে উঠতে পারে কিশোরগঞ্জ জেলার অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ। একইসঙ্গে সংরক্ষিত হবে এই ভঙ্গুর অথচ অমূল্য পরিবেশ।
পদ্মবিল আমাদের এলাকার রত্ন। অথচ পদ্মের এমন এক স্বর্গরাজ্য এতদিন অবহেলায় পড়ে রয়েছে, তা ভাবতে কষ্ট হয়। এই বিল শুধু ফুল নয়, বহন করে একটি গ্রামের ইতিহাস, আবেগ এবং প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের নিরব সাক্ষ্য।
এখন সময় এসেছে এই পদ্মবিলকে ‘প্রকৃতির নীরব কবিতা’ হিসেবে জাতীয়ভাবে তুলে ধরার। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও পরিবেশপ্রেমী সবাই মিলে যদি একটু এগিয়ে আসে—তাহলেই এই বিল শুধু দড়িজাহাঙ্গীরপুরের নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের গর্ব হয়ে উঠবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক- খায়রুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক - সোহেল রানা
সম্পাদকীয় কার্যালয়- ৫২২ আইনুল্লাহ স্কুল রোড, স্বল্পমারিয়া, বএিশ, কিশোরগঞ্জ।
০১৯১২৫৫০৭২৭,০১৭২৪৫৭৪২১৭
Copyright © 2026 কালের নতুন সংবাদ. All rights reserved.